আত্নহত্যাকে না বলুন, জীবনের সৌন্দর্যময়তা উপভোগ করুন

প্রকাশিত: ২:৩১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২০ | আপডেট: ২:৩১:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২০ |

আত্নহত্যা, সোজা বাংলায় মোটাদাগে যাকে অভিহিত করা যায় স্বপ্নের পরিসমাপ্তি হিসাবে। মানুষ যখন নিজের প্রতি বা জীবনের প্রতি তীব্র বিষন্নতায় ডুবে যায় তখনই ঘটে অস্বাভাবিক এই অপমৃত্যু। যার জন্য দায়ী সে নিজেই। মৃত্যু খুব স্বাভাবিক বিষয় যা প্রকৃতির নিয়মেই ঘটে কিন্তু আত্নহত্যা একধরনের কৃত্রিম মৃত্যু। এই কৃত্রিম মৃত্যু বা আত্নহত্যা শুধুমাত্র একজন মানুষের জীবনের সমাপ্তি ঘটায় না বরং অনেক স্বপ্ন বা প্রত্যাশারো পরিসমাপ্তি ঘটায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমাদের সামাজিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অবকাঠামো স্বাভাবিক ভাবেই এ ধরনের নোংরা মানসিকতা বা কাজের চরম বিরুদ্ধে। তবুও সাম্প্রতিক সময় বা বিগত ১০-১৫ বছরে মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মারফত আমরা জেনেছি বহু আত্নহত্যার মতো জঘন্যতম কাজের কাহিনী৷
উদাহরণ স্বরূপ ;
১.যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় শ্বশুর বাড়ির অত্যাচারে আত্নহত্যা করলেন গৃহবধূ।
২.প্রেমে ব্যর্থ হয়ে অজানায় পাড়ি জমালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী।
৩.গোপন মুহূর্ত ফাঁস হবার হুমকিতে জীবন নাশের পথ বেছে নিলেন তরুণী।
৪. এস. এস সিতে এ প্লাস না পাওয়ায় আত্নহত্যা করলো এক শিক্ষার্থী।
কি খুব পরিচিত লাগছে না? হ্যাঁ, এগুলো কোন না কোন সময় আপনার দেখা আত্নহত্যার সাথে সম্পর্কিত নিউজের শিরোনাম। নিজের জীবন নাশ যেমন হয়েছে তেমনী এরা অজানায় পাড়ি দিয়ে অঝোরে কাঁদিয়েছে কাছের মানুষগুলোকে। কত ভরসা, আশা কিংবা ভালোবাসায় না ছিলো চলে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য। আবার, এটাও সত্যি যে তাদের জীবন নাশের পিছনে এই কাছের মানুষগুলোই দায়ী। কেননা, এরাই ভালোবাসার চেয়ে গুরুত্ব দিয়েছে যৌতুকের টাকাকে, ভালো মানুষ না বানিয়ে এ প্লাস নির্ভর পড়াশোনায় বাধ্য করছে সন্তান বা আগামীর ভবিষ্যৎকে, সত্যিকারের ভালোবাসাকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রাধান্য দিয়েছে অশ্লীলতা নামক হীনমন্যতাকে, ভালোবাসায় সাড়া দিয়ে হিংসাত্মক মানসিকতা প্রকাশ করেছে প্রিয় মানুষটির কাছে। যে হয়তো চেয়েছিলো সারাজীবনের সঙ্গী হতে, ভালোবেসে সাজাতে সংসার আপন মহিমাতে। দূর্ভাগ্য আমাদের মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভুল সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে জীবনের সমীকরণ টাকে। যাদের প্ররোচনায় এই নোংরা তথা অবাস্তব পথ বেছে নিয়েছিল প্রিয় মানুষগুলো তারা কেউ হয়তো টানছে জেলের ঘানি কেউবা আইনের বেড়াজালে ছাড়া পেয়ে ছুটছে অবিরাম। যেন এদের ধরাছোঁয়ার কেউ নাই! কিন্তু, একটিবার প্রিয় মানুষগুলোর সত্যিকারের অবস্থান বা মনের কথা বুঝলে সমাজ হতো না কলুষিত, জীবনের সঙ্গী হতো না একাকিত্ব।
আত্নহত্যা নামক সামাজিক বিষফোঁড়া শুধুমাত্র আমাদের দেশের নয় বরং বৈশ্বিক এক চরম মহামারীর পৌঁছেছে। বাংলাদেশ তালিকায় নিচে থাকলেও দ্রুত উপরে উঠছে স্পষ্ট ভাবেই প্রতীয়মান। একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সালে বাংলাদেশে ১৯,৬৯৭ জন আত্নহত্যা করেছে। অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০০২ থেকে ২০০৯ অব্দি ৭৩,৩৮৯ জন আত্নহত্যা করেছে এবং আত্নহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ। যাদের অধিকাংশ অল্পবয়সী এবং ৮৯ শতাংশ নারী। চোখ কপালে উঠছে কি??
নানা সামাজিক অবক্ষয় বা পশ্চিমা সংস্কৃতির অবাধ চর্চা যার জন্য দায়ী। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, প্রতিবছর বিশ্বে গড়ে আট লাখ মানুষ নানা কারণে আত্নহত্যার পথ বেছে নেয়। সেকেন্ডে হিসাব করলে যা দাঁড়ায়, প্রতি ৪৫ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্নহত্যার পথে ঝাঁপিয়ে পড়ে!
আত্নহত্যার কারণ হিসাবে একসময় হতাশা বা বর্তমানের আধুনিক শব্দ ডিপ্রেশনকে দায়ী করা হতো অধিকাংশ ক্ষেত্রে। তবে, এ ধারণার যথেষ্ট পরিবর্তন ঘটেছে। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ১০ শতাংশ লোকের আত্নহত্যার পিছনে কোন কারণ থাকে না। ১৫-১৬ শতাংশ লোক বংশানুক্রমিক ভাবেই সে পথে পা বাড়ায়। এমনকি, যারা এসব কারণে আত্নহত্যার পথে পা বাড়ায় তাদের মস্তিষ্কের গঠন স্বাভাবিকের চেয়ে ভিন্নতর।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ আমল থেকেই আত্নহত্যা একটি দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে বিবেচিত। বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালে যে পেনাল কোড (১৮৬০) গ্রহন করে তা ব্রিটিশ আইনের অপভ্রংশ৷ যদিও ১৯৭১ সালের পরে কাউকে আত্নহত্যা চেষ্টার জন্য সাজা দেয়া হয়েছে বলে জানা নেই।
বাস্তবতা হলো, আইনের বেড়াজালে আত্নহত্যাকে না জড়িয়ে সামাজিকভাবে এ ধরনের হীন কাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত। যেন কেউ পা না বাড়ায় নোংরা অজানার পথে কয়েক সেকেন্ডের ভয়াবহ ভুলে।
নিমোক্ত কিছু মেনে চললে হয়তো আত্নহত্যার পথ থেকে আমরা দূরে অবস্থান করতে পারি ;
১.ধর্মীয় অনুশাসনের প্রয়োগ
২.দেশীয় সংস্কৃতির শুদ্ধ ও মার্জিত চর্চা
৩. পশ্চিমা সংস্কৃতির চর্চা বন্ধ করা কেননা, আমাদের সামাজিক সংস্কৃতি বা ধর্মীয় সংস্কৃতির সাথে পশ্চিমা সংস্কৃতি সাংর্ঘষিক।
৪.সুস্থ চিত্ত-বিনোদনের ব্যবস্থা
৫.পরিবার তথা কাছের মানুষের সাথে স্বাভাবিক ভাবে মিশতে পারার সুযোগ প্রদান যেন সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়।
৬.নিয়মিত আত্নহত্যা বিরোধী প্রচার প্রচারনা করা। প্রয়োজনে লাইভ মিডিয়াকে জনসচেতনতার অংশ হিসাবে ব্যবহার করা।
আজ ১০ ই সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্নহত্যা প্রতিরোধ দিবস। আমাদের উচিত এই দিবসের মূল প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে এগিয়ে চলা। কখনো, কোন অবস্থাতেই কাছের কেউ যেন আত্নহত্যায় শামিল না হয় সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সজাগ থাকা। প্রয়োজনে আত্নহত্যা এবং সংশ্লিষ্ট বাস্তবতা নিয়মিত বুঝানোর স্বার্থে পরিবার, সমাজ বা আরো বড় পরিসরে র‍্যালি বা সচেতনতা মূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। আত্নহত্যা নামক ঘৃণ্য তথা জঘন্য কর্মকান্ডকে না বলাই হোক আমাদের চির প্রতিজ্ঞা।
“আত্নহত্যাকে না বলুন
জীবনের সৌন্দর্যময়তা উপভোগ করুন “।।
জীবন হোক সমৃদ্ধ ও মধূুর। শুভকামনা সকলের তরে।
লেখকঃ
অনন্য প্রতীক রাউত 
আইন বিভাগ, 
ব্যাচঃ১৫ (২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ)
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।