ইতিহাস-ঐতিহ্যে রংপুর

আসিফুর রহমান হিমেল

ফিচার ডেস্ক

প্রকাশিত: ২:৫২ অপরাহ্ণ, জুন ৪, ২০২১ | আপডেট: ২:৫২:অপরাহ্ণ, জুন ৪, ২০২১ |

যেদিকেই চোখ যায় দেখা যায় সবুজের সমারোহ। অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য! এ যেন স্বস্তির পরিবেশ। ছিমছাম সুন্দর একটি জনপদ। গ্রামীণ যে দৃশ্য দেখা যায় তা মন কেড়ে নেয় সবার। বলছিলাম উত্তরাঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধ জেলা রংপুরের কথা।

বৃটিশ শাসনে এই এলাকার জমিতে চাষ হতো নীল। কথিত আছে নীলকে বলা হতো রঙ্গ। এই রঙ্গ থেকেই রঙ্গপুর নামের উৎপত্তি। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে পূর্বের রঙ্গপুর থেকেই কালক্রমে রংপুর নামটি এসেছে। রংপুরের মানুষের প্রাণে মিশে আছে অবিস্মরণীয় সে ইতিহাস। ঐতিহ্য, সাহিত্যকর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতিতে পরিপূর্ণ সুপ্রাচীন ও বিভাসিত এ নগর।

রংপুরের ইতিহাস দিন ফুড়িয়ে রাত গড়ালেও শেষ করা যাবে না । ইতিহাসের পাতায় ১৫৭৫ সালে সম্রাট আকবরের সেনাপতি রাজা মানসিংহ রংপুর দখল করলেও ১৬৮৬ সাল পর্যন্ত এটি মুঘল সাম্রাজ্যের সাথে একীভূত হয়ে যায়নি। তবে ১৬৮৬ এর পরে রংপুর সম্পূর্ণভাবে মোঘল সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। ফকির আন্দোলন ও প্রজা বিদ্রোহ রংপুরের ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষি এই রংপুর । ১৬ ডিসেম্বর ১৭৬৯ সালে জেলা শহর হিসেবে এবং ১৮৬৯ সালে রংপুরকে পৌরসভা ঘোষণা করা হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের প্রাচীনতম পৌরসভাগুলোর একটি। রাজা জানকি বল্লব সেনের পৃষ্টপোষকতায় ১৮৯২ সালে একটি পৌরসভা ভবন তৈরি করা হয়েছিল। যা ইতিহাসের সাক্ষর বহন করে। ২০১০ সালে এসে আটটি জেলা নিয়ে রংপুর বিভাগ গঠিত হয়েছে। তাই এক বাক্যেই বলা যায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্রে ভরপুর এই রংপুর।

অন্যদিকে রংপুর নদীর ¯্রােতে গেঁথে আছে পুরো অঞ্চল। তিস্তা, যমুনা, ঘাঘট, করতোয়া, ব্রম্মপুত্র, পূনর্ভবা প্রভৃতি নদ-নদী এই অঞ্চলে প্রবাহিত হয়ে চলছে। অনেক রাজবংশ এখানে রাজত্ব করে গেছে। নগরে পানি নিষ্কাশনের জন্য মাতা শ্যামা সুন্দরীর নামে খাল শহর দিয়ে বয়ে চলছে।

এই জেলার শতরঞ্জি ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প। একসময় রাজা-বাদশাহদের কাছেও এর কদর ছিল মোগল সম্রাট আকবরের দরবারে শতরঞ্জি ব্যবহার করা হতো। জমিদারদের ভোজনের আসনেও ছিল এর ব্যবহার। এই শতরঞ্জি নদীপথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেত। এখনও রংপুরের শতরঞ্জি রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে।

ভাওয়াইয়া গানের ভূমি রংপুর। দিনভর সংসারের খোরাক যোগাতে যে কৃষক-দিনমজুর মাঠে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন-সেই তিনিই সন্ধ্যে বেলায় কুঁড়ে ঘরের সামনে ছোট্ট উঠোনে পাটি বিছিয়ে মনের খোরাক যোগাতে মজে যায় ভাওয়াইয়ায় গানে। তবে হাল-আমলে দোতরা-সারিন্দার জৌলুশ কমে গেলেও বৃহত্তর রংপুরের গ্রামাঞ্চলে এখনও বসে ভাওয়াইয়ার আসর। ভাওয়াইয়া উত্তরবঙ্গের নিজস্ব লোকগীতির জন্ম এই রংপুওে ।

বাঙ্গালী নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্মভূমি এই রংপুরেই। শহর থেকে একটু দূরেই পায়রাবন্দ গ্রামে এই মহীয়সী নারীর জন্ম। তার নামেই প্রতিষ্ঠা হয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর । মধ্যযুগের বিখ্যাত কবি হেয়াত মাহমুদ ও রংপুরে জন্মগ্রহণ করেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, সংসদের স্পিকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান, অভিনেতা, পরিচালক সহ অনেক বিখ্যাত ব্যাক্তির জন্ম এই রংপুরে।
রংপুরে রয়েছে প্রাচীন নিদর্শনাবলী ও দর্শনীয় স্থান। দৃষ্টি কাড়বে শহরের দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে তাজহাট জমিদার বাড়িটি। এরপর রয়েছে রংপুর জাদুঘর, চিড়িয়াখানা, কারমাইকেল কলেজ, কেল্লাবন্দ মসজিদ, দেওয়ানবাড়ী জমিদার বাড়ি। ১৫০ বছর পূর্বে রাজা গোপাল লাল রায় বাহাদুর প্রতিষ্ঠা করেছেন জাদু নিবাস । রংপুর টাউন হল ও পুরাতন জর্জ কোর্ট ও একই সময়ে স্থাপিত হয়েছিলো। শহর থেকে দূরে রয়েছে লালদিঘী মসজিদ, ইটকুমারী জমিদার বাড়ি, দেবী চৌধুরানী জমিদার বাড়ি, ভিন্নজগত সহ অনেক প্রাচীন নিদর্শনবলী ও দর্শনীয় স্থান। রংপুর তামাক ও হাড়িভাঙ্গা আমের জন্য বিখ্যাত। রংপুর থেকেই ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম বাংলা পত্রিকা ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’।
আমার চোখে রংপুর ইতিহাস-ঐতিহ্যের শেকড়। এই রংপুর প্রাককৃতিক সৌন্দর্যের তীর্থ স্থান।

শিক্ষার্থী,গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, 
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ।