জীবনের মুখোমুখী

প্রকাশিত: ৯:০৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ৬, ২০২০ | আপডেট: ৯:১০:অপরাহ্ণ, জুলাই ৬, ২০২০ |

গ্রামটি ছিলো অচিনপুরে। রফিকের বড় চার ভাই বিয়ে করে সংসার করছে। বছর কয়েক পেরিয়ে রফিকও একদিন দুই কন্যা সন্তানের জনক হল। বড় মেয়ের নাম রাখলো রিমি এবং ছোট মেয়ে ঝিমি। কাছাকাছি বয়স হওয়াতে ছোটবেলা থেকেই রিমি-ঝিমি একই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতো। দু’জনই তীক্ষ্ণ মেধাবী হওয়ায় বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও তাদের অত্যন্ত স্নেহ করত।
রিমি ঝিমি যেন একে অপরের পরিপূরক ছিল। তারা একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারতো না একটি মুহূর্তও। তবে বরাবরই রিমির ভুল করা স্বভাব ছিল। আর সবসময় সেই ভুলটা ধরিয়ে দিত ঝিমি। ঝিমি বয়সে ছোট হলেও সে রিমির থেকে চালাক ও বুদ্ধিমতি ছিল। এভাবেই সময় যেতে যেতে রিমির এসএসসি পরীক্ষার সময় হয়ে গেল। তখন ঝিমি পড়তো অষ্টম শ্রেণিতে। রফিক বরাবরই চাইত মেয়েরা পড়াশোনা করে অনেক বড় হোক, ভালো কিছু করুক, নিজেদের অবস্থান আরও উন্নীত করুক। এই নিয়ে তার উচ্ছ্বাসের শেষ ছিলো না বটে। এসএসসি পরীক্ষায় বড় মেয়ে রিমি খুবই ভালো করল। তখন রফিক চিন্তা করলো মেয়েদের কে ভালো কোন প্রতিষ্ঠানে পড়াবে।
কিন্ত যৌথ পরিবারে রফিকের এই সিদ্ধান্তে তার ভাইয়েরা দ্বিমত পোষণ করল। লোভ আর হিংসায় রফিকের ভাইয়েরা তাকে বলতে লাগলো মেয়েদের এতো পড়াশোনা করানোর কি দরকার? এতো পড়াশোনা করে কি করবে? তখন থেকেই ভাইয়েদের সাথে রফিকের দ্বন্দ্ব-কলহ লেগেই থাকতো। এর ফলে রিমি ঝিমিও পরিবারে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে থাকলো। মানসিক অত্যাচার আর কটু কথা তাদের আঘাত করল দিনের পর দিন। মেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে একমাত্র তাদের বাবা মার ই সমর্থন থাকল। গ্রামের অন্য সকল সমাজপতি ও পাড়া পড়শীরা বলতে লাগল মেয়েদের পড়াশোনা করানোর দরকার নেই বিয়ে দিয়ে দাও। সর্বোপরি যেন বিষাক্ত এক পরিস্থিতি ।
একদিন রিমি তার বাবাকে বলল আচ্ছা আব্বু মেয়ে হয়ে জন্মানো কি অন্যায়? একটি সমাজে মেয়েরা কি এভাবেই লাঞ্চিত হবে? পরিস্থিতি যখন বিষমাখা তখন রফিক স্ত্রী ও দুই কন্যাকে নিয়ে পাড়ি জমালো শহরে। দুই মেয়েকেই শহরের ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করালো। মেধাবী হওয়ায় পড়াশোনা করে ভালো মেডিকেল কলেজে চান্স পেল রিমি আর ২ বছর পরে ঝিমি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেলো।বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডিতেও পড়াশোনায় রীতিমতো ভালো অবস্থানে করে নিল দুজনেই। কয়েক বছর পরেই রিমি ঝিমি সফলতার মুখ দেখতে পেল। রিমি এমবিবিএস ডাক্তার আর ঝিমি তার নিজের বিভাগেই লেকচারার হল। পড়াশোনা শেষে একদিন তারা গ্রামে যায় বেড়াতে। সমাজে তখন তাদের মর্যাদা অনেক শীর্ষে। সবাই সম্মান দেয়, তাদের সফলতার গল্প শুনে অনেকে অনুপ্রেরণা পায়। রফিকের ভাই-প্রতিবেশীরা সবাই তখন তাদের ভুল বুঝতে পারে।
রিমি ঝিমি নতুন করে উদ্যোগ নিল গ্রামের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করাবে। সামাজিক দায়ভারকে তারা এভাবে মুখোমুখি দাড় করাবে যে, সমাজ কেন মেয়েদেরকে ভিন্ন চোখে দেখে? মেয়ে হয়ে জন্মানো কি আসলেই অন্যায়? সমাজের মানুষের অবজ্ঞাপূর্ণ আচরনে মেয়েরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত নয় কি? শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড এর মাধ্যমে সকল অধঃপতন থেকে মুক্তি সম্ভব। আদৌ সমাজকে এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর জানানো গেলেই এর থেকে মুক্তি সম্ভব।
দৃঢ় প্রতিজ্ঞা কখনোই বৃথা যেতে পারে না। লক্ষ্য যদি ঠিক থাকে তাহলে জীবনে সফলতা আসবেই। ব্যর্থতা তো একটা পরীক্ষা মাত্র। লক্ষ্য আর দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো বলেই রিমি ঝিমি সমাজের সকল বাধাকে উপেক্ষা করে মাথা উঁচু করে দাড়াতে পেরেছে। এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখেই তারা অচিনপুরকে আলোকিত করে তুলবে এই তাদের বিশ্বাস।
বিঃদ্রঃ গল্পটি বাস্তব অভিজ্ঞতার খন্ড চিত্র।
শিক্ষার্থী কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়