তারুণ্যের অনুভূতিতে একুশে’র চেতনা

মেহেরুজ্জামান সেফু

জিটিসি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১০:৪১ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১ | আপডেট: ১০:৪১:পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১ |

পৃথিবীর বুকে একটি মাত্র দেশ বাংলাদেশ। যারা ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। তাইতো প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারিতে সে সকল ভাষা শহীদের প্রতি জানানো হয় বিনম্র শ্রদ্ধা। সেটি কেবল এ দেশেই নয় বরং এ দিনটিকে বিশ্বব্যাপী পালন করা হয় একই মর্যাদায়। এ দিনটির তাৎপর্য সম্পর্কে জানবো তরুণ প্রজন্মের কাছে।

নাজিয়া (সরকারি তিতুমীর কলেজ) বলেন, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি,আমি কি ভুলিতে পারি ” না আমরা কেহই এই ত্যাগ কখনোই ভুলতে পারি না। যারা নিজের দেশের মাতৃভাষার জন্য নিজের প্রাণকে বলি দিতে পারে তাঁদের কখনওই ভুলে যাওয়া যায় না। একুশ প্রতিটি বাঙালির জীবনের অহংকার এর দিন এদিন আমাদের বাংলা ভাষার দিন। নিজের ভাষায় কথা বলতে পারা যে কতটা স্বস্তির তা দুনিয়ার কোথাও নেই। বাঙলা ভাষা যে কতটা মধুর তা আমাদের মায়ের মুখে শুনলেই বোঝা যায়। এই মায়ের ভাষাকে বাঁচাতে সালাম,রফিক,বরকতসহ আরও অনেকেই ২১শে ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সাল প্রাণ দিয়েছে যা পৃথিবীর কোথাও এমনটি হয় নি । অতএব এই দিন আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন।

জায়িদ হাসান জোহা (আরবী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়) বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারী, কথাটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শহীদ মিনার, আর কানে ভেসে আসে প্রভাত ফেরীর গান। শহীদদের প্রতি সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে ফুল দেওয়ার আগ্রহে আমাদের কোনো কমতি নেই। কিন্তু, সত্যিকারার্থে শুধু পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ আর ভাই হারানোর গান গাইলেই কী আমাদের দায়বদ্ধতা শেষ? শুধু এতেই কি তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়ে যায়? শহীদ মিনার রঙে রঙে সাজানো, শত ফুলে সুশোভিত। অথচ রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষার অবস্থা শোচনীয়। পরিচর্যাহীনতার কারণে আজ তা জঞ্জালে ভরে যাচ্ছে। ভাষার শুদ্ধ চর্চা হারিয়ে যাচ্ছে ভিন্ন ভাষার মিশ্রণে আর শব্দ সংক্ষেপণের গহবরে। আমাদের নতুন প্রজন্মের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে কথোপকথনের এক বিশেষ ভাষা হলো ইংরেজি ভাষায় বাংলা উচ্চারণ, যার নাম কিনা ‘বাংলিশ।’ এটা শুধুমাত্র ভাষার বিকৃতিই না, বরং এটা আমাদের ধীরে ধীরে মূল বাংলা ভাষার ব্যবহার ভুলিয়ে দিচ্ছে। যারা দীর্ঘদিন যাবত এই বিকৃত রুপ ব্যবহারে অভ্যস্ত, তাদের অনেককেই বাংলা লিখতে দিলে প্রতি বাক্যে ভুল মেলে একাধিক। এছাড়াও কথা বলতে গেলে বাক্যের মাঝেমাঝে ভিন্ন ভাষার শব্দের ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার শব্দের ব্যবহার যেন তাদের আধুনিকতা বাড়িয়ে দেয়! সংস্কৃতির ব্যাপারে বলতে গেলে, আমাদের প্রজন্ম বাংলা ভাষার গানের কথা ভুলেই গেছে। ইংলিশ, হিন্দি, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ ভাষার গানের ভীড়ে আমাদের প্রজন্ম ভুলেই গেছে জারি, সারি, বাউল, মুর্শীদি, পালা বা গম্ভীরার মত বাংলা ভাষার বিভিন্ন রকমারি গানের কথা। কেউ কেউ তো গর্ব করে বলেই বসে, বাংলা গান আমার অতটা পছন্দ না। তেমন শোনা হয় না। এই বলে ইংলিশ গানের পছন্দের শিল্পী তালিকা বলতে শুরু করে।
আসলে, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ছাপিয়ে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা করে যাবো সারাবছর, আর শুধু একটি দিন শহীদ মিনারে ফুল দিলেই দায়িত্ব সম্পন্ন হয়ে যাবে ভেবে থাকলে আমাদের চেতনা শক্তিকে নতুন করে জাগ্রত করা উচিত। বরং এই কাজ ভাষা শহীদদের রীতিমতো অপমান করার শামিল। কারণ, আমাদের শহীদেরা প্রাণ দিয়েছেন নিজেদের ভাষাকে বিশ্বের দরবারে মেলে ধরার এক মহৎ আশা নিয়ে, ভিনদেশী ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা করে আত্মতুষ্টিতে ভোগার জন্য নয়।

সুমাইয়া হাফসা (ইডেন মহিলা কলেজ) বলেন, বাঙালি জাতির এক গৌরবময় ইতিহাস হলো ২১ শে ফেব্রুয়ারি। বাংলা ভাষা অর্জন করার জন্য জীবন দিতে হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই ভাষাকে শুধু একটা দিনের জন্যই মর্যাদার আসীনে বসানো হয়। বাংলাদেশের মানুষ এখন ভাষাটাকে প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে বিকৃত করছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাংলা ভাষা দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আধুনিকতার নামে ইংরেজি ভাষা এবং বাংলা ভাষাকে একত্রিত করে নতুন নাম দিয়েছে বাংলিশ। এছাড়াও বর্তমানে বাঙালি জাতি বিদেশি ভাষা শেখার প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে । যা বাংলা ভাষা শেখার এবং সমৃদ্ধ করার অন্তরায় সৃষ্টি করছে। আমাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আগে বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতে হবে, এবং বাংলাটাকে আগে শিখতে হবে… এ সম্পর্কে কবি গুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন,””আগে চাই বাংলাভাষার গাঁথুনি, তারপর হবে ইংরেজি শেখার পত্তন।

আলাউদ্দিন আল বোখারি, (শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) বলেন, একুশ শব্দটা বাঙালি চেতনার শিকড়।আমাদের স্বাধীনতার বীজ,আত্নপরিচয়ের সংগ্রাম,কিংবা অধিকার সচেতনতার হাতেখড়ি এই একুশের মাধ্যমেই।কিন্তু,একুশের এই চেতনাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয় কোনো সমস্যার সমাধান আমরা আদৌ করতে পারছি কি?আরেকটি বিষয়,দেশ ও জাতি হিসেবে যে মাতৃভাষা নিয়ে আমাদের এতো গর্ব ও অহংকার,সেই মাতৃভাষা চর্চাকে উৎসাহিত করার জন্য দেশে সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় নীতি প্রয়োজন।প্রতিবছর একুশ এলে আমাদের যে শোক ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়,এটা আমাদের মুখের ভাষার মাধ্যমে যেন আমরা সারাবছরই লালন করতে পারি,অপভাষার বিস্তার রোধ করি,এই ঐতিহ্যমন্ডিত মাতৃভাষাকে ভালোবাসি।একুশের মাধ্যমেই আমাদের জাতীয় চেতনার ঢেউ আরেকবার উদ্বেলিত হোক,এই কামনা করি।সকল ভাষা শহীদদের স্মরণ করছি,তাদের জন্য অপরিসীম শ্রদ্ধা।

রেদওয়ানুল হক (বিজ্ঞান বিভাগ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ) বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জন্য দু:খ, ত্যাগ আর গৌরবানুভূতির এক অনন্য সংমিশ্রণ। প্রতি বছর আমরা শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের চেষ্টা করি। তবুও একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে তাদের আত্মত্যাগের ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারবে না। তাদের অবদানের জন্যই তো আজ আমরা প্রাণ খুলে বলি আমাদের মায়ের ভাষা বাংলা। তাই পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি সকল ভাষা শহিদদের।

মোঃ মুনজুর এলাহী সৌরভ (কৃষি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) বলেন, আমাকে যদি আমেরিকা, রাশিয়া, জাপান, চীন বা অন্য যেকোনো দেশের কোনো ছাত্রের সাথে তর্ক করতে দেয়া হয় কোন জাতি সেরা সেই বিষয় নিয়ে, আমি গর্বের সাথে বলতে পারবো আমরা আমাদের ভাষার জন্য জীবন দিয়েছি, যেটা কিনা অন্য কোনো দেশের কেউ বলতে পারবে না। এই ভাষার প্রত্যেকটা বর্ণ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের রক্ত দিয়ে কেনা। একুশ আমাদের অহংকার। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পাওয়ার পর ২১ শে ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলা ও বাঙালির নয়, ২১ শে ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বজনীন। বাঙালির এই অর্জন বাংলাদেশের ক্ষুদ্র মানচিত্রকে উজ্জ্বল করেছে বিশ্বজোড়া মানচিত্রের পাশে।