পদ্মাসেতুর একেকটা স্প্যান আর মিডিয়ার হুড়োহুড়ি!

মো. জুলফিকার হাসান পিয়াস

সাবেক এজিএস,বঙ্গবন্ধু হল ছাত্র সংসদ,ঢাবি

প্রকাশিত: ২:২৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১০, ২০২০ | আপডেট: ২:২৯:অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১০, ২০২০ |

পৃথিবীর অনেক দেশেই পদ্মা সেতুর চেয়ে কয়েকগুণ বড় সেতু রয়েছে। শুধু বৃহদাকার বলে নয়, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায় কিংবা দৃষ্টি নান্দনিকতায় তার বেশ কিছুর কাছে পদ্মা সেতু আহামরি গোছের অন্তত নয়। তারপরেও মিডিয়ার এতো হুড়োহুড়ি কেন! এর কারণও আছে বৈকি। পদ্মা সেতু অনন্য আর একটা জায়গায়। সেই অনন্যতা হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের একটা দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে কত ধরনের বাঁধা আসতে পারে আর সেগুলো দৃঢ়তার সাথে উৎরে যাবার, সেই অনন্যতা কিভাবে একটি রাষ্ট্র তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে তার দৃঢ়তার। এটা আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় পরিবারগুলোর নিজস্ব ভাগ্য উন্নয়নেও রোল মডেল বললে ভুল হবে না।

এক্ষেত্রে উন্নয়নে প্রধান বাঁধা ফাইন্যান্স বা পুঁজি একটা গরীব দেশ কিভাবে সংস্থান করবে তার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা শুধুমাত্র দৃঢ়তাই দেখান নি, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য তার একটা অন্যতম উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের মাঝে যেভাবে দুর্নীতির অভিযোগ উঠিয়ে পদ্মা সেতু হওয়াকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিদায় নিয়েছিল, সরকার প্রধান সেই অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগটি নিয়ে তদন্ত ব্যবস্থার পাশাপাশি নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মাসেতু করার চ্যালেঞ্জটাও গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে অবশ্য কানাডার আদালতে এই সমস্যার সমাধান হয়। একদিকে পদ্মাসেতু দুর্নীতির অভিযোগ খারিজ হয়ে যায় এবং আরও পরে বাংলাদেশের প্রতি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠানো বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান লুইস মোরেনো ওকাম্পো নিজেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত হন। দুর্নীতি আমাদের দেশে রিচুয়ালে পরিণত ঠিকই, আর তাই এটাকে টার্গেট করাই ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য সবচেয়ে সহজ অস্ত্র। সেই উন্নয়নযাত্রা ব্যাহত করবার অস্ত্রের যোগান কিন্তু হয়েছে এদেশ থেকেই।

আমাদের দেশের আর একটা চ্যালেঞ্জ বরাবরই এসেছে, আর সেটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মোকাবেলা করে এগিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ। পদ্মাসেতু যখন হতে শুরু করে তখন দেশের অন্যতম প্রধান একটা রাজনৈতিক দলের নেত্রী হঠাৎ বলে বসেন এ সেতু জোড়া লাগানো সেতু, এতে উঠলে ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা অনেক। তিনি এই সেতুতে যাতে কেউ না ওঠে তার আহবানও জানান। আশা করি জননেত্রী শেখ হাসিনা একবার হলেও সেই নেত্রীকে পদ্মাসেতুতে সাথে করে উঠবার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানাবেন। এছাড়াও নানাসময় পদ্মাসেতু নিয়ে মাঝে মাঝেই বিষেদাগার করেছে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল তাতে গঠনগত নয় বরং সমালোচনার এবড়োথেবড়ো রূপটা দেখেছে বাংলাদেশ।

জনতুষ্টিবাদের এই সময়ে জনমত কিংবা কুসংস্কার ভর করেছিলো পদ্মাসেতুর ওপর। তাতে অবশ্য শক্ত ভিত্তির পদ্মা সেতু নড়বড়ে হয়নি একটুও। বরং এই পদ্মাসেতুতে মাথা লাগবে প্রবণতা, আমাদের চলমান সামাজিক কুসংস্কারবোধ, গোঁড়ামি আর অপরিবর্তনশীল মানসিকতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে শক্তভাবে।

সবশেষে পদ্মাসেতু হবার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যা ছিল তা এদেশের ভূ-প্রকৃতি আর নদী তলদেশের ভঙ্গুর গঠন প্রকৃতি। পৃথিবীর সবচেয়ে ভঙ্গুর নদী তলদেশকে শাসন করে পদ্মাসেতু মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, এ হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সেতু নয় কিংবা সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দনগুলোর একটিও নয়। তবে নিঃসন্দেহে পদ্মাসেতু পৃথিবীর জটিলতম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তৈরি সেতু। আর তার অধিকারী মাঠে-ঘাটে কাজ করা হাজারো কৃষকের বাংলাদেশ, এদেশের প্রতিটি মানুষ।

তাই পদ্মাসেতুকে নিয়ে মিডিয়ার, আমাদের এই আদিখ্যেতাটুকু এতটুকুও চোখে লাগে না। বরং বারবার নিজেদের গর্বের উপকরণ হয়ে নিজেকেই রাঙ্গিয়ে দেয় জয়ের নেশায়। জানান দেয়, ভাগ্যোন্নয়নের জন্য অনেক কিছুর দরকার পড়ে না। একটু সৎ সাহস, সঠিক নেতৃত্ব আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞা যে কাউকে লক্ষ্যে পৌছে দিতে পারে। শেখ হাসিনা তেমনই একজন অহংকারের নাম।

আমাদের অনেক গাল-গল্প, উপকথা আছে, তবে পদ্মাসেতু একটা উদাহরণ হয়ে থাকলো। নানা সমস্যায় জর্জরিত একটা সমাজে বা পরিবারে সন্তানকে বড় করবার জন্য বাবা মাকে কিছুটা কর্তৃত্ববাদী, পিতৃ সুলভ হতে হয়। শেখ হাসিনা আমাদের প্রচন্ড অহংকারের মাতৃ সুলভ কারণ।

বাংলাদেশ, উন্নয়ন আর শেখ হাসিনা,
স্বাগতম বাংলাদেশ।