বৃটিশপল্লীর দীনেশ -শাহমুব জুয়েল

সাহিত্য ডেস্ক ডিবিবি

ডেইলি বাংলাদেশ বার্তা

প্রকাশিত: ৭:৫৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০২০ | আপডেট: ৭:৫৯:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০২০ |

জলমৌসুমে কামাই নেই সাকের আলীর। সংসারে নুন- আনতে পান্তা ফুরোয় তার। স্ত্রী মমেনা বেগমের গুঁতোগুঁতিতে সকাল সকাল কাজের খোঁজে বাড়ি ছাড়ছে সে। হাঁটতে হাঁটতে ভরতখালী রেলস্টেশনে পৌঁছে গেল। রেলস্টেশন অনেকদিন আগেই বন্ধ হওয়ায় তেমন জনমানুষ নেই। হরিৎপাতায় মেখে আছে পাটাতন। রেলের রেলিঙে জং ধরে ধরে খষে পড়ছে পাটাতনের শরীর। রেলের পাতগুলো বেশ পুরোনো। দীনেশের বাবা বলল – নাকি! এগুলো সেই বৃটিশ আমলের; সহজে নষ্ট হওয়ার নয়। তবুও সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে আবার ব্যবহারের অভাবে ক্ষয়ও হয় তাই কিছুটা মরচে ধরেছে। বৈ আর কিছু নয়।

সাকের আলী সিগেরেট টানতে টানতে চারদিকে চোখ মেলে ধরল। সামনে দেখা যায় ভরতখালী স্টেশন। আগামাথা সমান কেবল জনশুন্য তাই কিছুটা বেমানানও বটে। কোথাও কেউ নেই, মনে মনে ভেবেছিল রেল ধরে শহরের দিকে পা রাখবে। হঠাৎ চোখ পড়লো স্টেশন ফটকের বাঁদিকে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে ভারি ব্যাগ, মনে হচ্ছে রেলের জন্য অপেক্ষা করছে সে । সাকের আলী এগিয়ে গিয়ে বলল- ভাই কোথাও যাবেন? অনেক্ষণ যাবৎ ট্রেনের অপেক্ষা করছি। কিন্তু কোথাও কাউকে দেখতে পেলাম না। আপনি কী এখানকার কেউ! না ভাই! সাকের আলী সিগেরেট টানতে টানতে স্টেশনের পেছনে চোখ উঁকি দিয়ে বলল- ঐ যে গেরাম, সে গেরামের পর আমার গেরাম। নাম আমার সাকের আলী। পিরিতি কইরা বিয়া করছিলাম। বউ শখ করে নাম দিয়েছে সাকু। সে থেকে গেরামের লোকে সাকু নামে চেনে। লোকটি হাসতে হাসতে বলল- তাহলে আপনি আমাদের গেরামের সাকু ভাই? জি আমি সাকু! আপনার সাথে দেখা হয়ে ভালোই হলো। গত কয়দিন গেরামে থেকে অজানা অনেককিছু জানলাম।

আচ্ছা সাকু ভাই। ভাবীর কি চেহারা সুরত খুব ভালা নাকি। সাকের আলী চমকে গিয়ে জবাব দিলো- আপনি জানলেন কী করে? সে মুখ আমটাতে আমাটাতে বলল- দোকানের কাছে পোলাপান বলাবলি করতে শুনেছি। আজকালকার পোলাপানতো জানেনই! খানাখন্দে ঘুরে আর এসব নিয়াই আলাপ চালায়। আমাগো যুগে এসব ছিল না। পেঠে ভাত নেই, আবার পরের নামে টিটকারি করবো। সেই সময় কী আছিল আমাদের? এখন তো ঘরে ঘরে খাওন আর খাওন। পোলাপাননের শরীরও বেহাল গরম হয়ে ওঠে।

সাকের আলীর মুখ পানসে হয়ে গেল। কতক্ষণ চুপ থেকে বলল- ভাই আপনি আসলে কে? একটু পরিচয়টা দিলে কথা বলতে দাঁড়ি থাকলো না। লোকটি মোঁচ এলিয়ে হাসতে হাসতে বলল- দেহি দেহি! মুখের আগুন দেন। সাকের আলী সিগেরেটের পেট ধরে টানছিল। সে চাওয়ামাত্র গোড়াটা এগিয়ে দিল। সিগেরেট ধরাতে ধরাতে লোকটি বলল- আমার নাম দীনেশ। সাকের আলীর মন খারাপ হয়ে গেল। তাহলে আপনি হিন্দু? জি আমি সনাতন ধর্মাবলম্বী। সে বুঝলাম কিন্তু কাপড় চোপড়ে তেমন মনে হলো না! এই দেখেন মানুষ চেনা কত দায়! সেসব বাদ, এবার বলুন কোথায় থাকেন? সে লম্ভা ইতিহাস দাদা!

আপনার গেরামের পরই বাস করতাম। বাড়িতে ভিটেমাটি ছাড়া তেমন চৌহদ্দি নেই। পেটের জ্বালায় এই স্টেশনের ট্রেনে চড়ে গেছিলাম রাজধানীর মোড়ায়। গেরামের মানুষহওয়ায় সেখানেও ঠাঁই হলো না। যেখানে পা রাখি ঠক আর ধান্দাবাজরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। রাস্তায় চুরি আর চিনতাইয়ের ভয়, বড় দালান কোটায় টাইবাবুদের আড্ডাখানা। সেখানে নেশার বড় বড় আস্তানা। নেশার টাকা জোগাড়ে তারা পুকুরচুরি করে। দেশের কাঠামোটা দিনের পর ঠুনকো হয়ে উঠছে। মাঝে মাঝে তারা আমাদের কামে নিলে হুমকি ধমকি দিয়ে কাম সারায় কিন্তু কানাকড়িও বাড়তি দেয় না। বরং গড়হাজিরার চেয়েও কম দিয়ে গাড়ে চড় বসিয়ে সদর রাস্তায় ছুড়ে দেয়। কখনো প্রাণেও মেরে দেয়। এ এক প্রাণঘাতি নগর। দূর ভাল্লাগেনা আর!

নগরের বেবাক টালবাহানা দেখে মন ছোট হয়ে গেল। বেকায়দার জীবন। দিনদুপুরে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল। সুন্দর ট্রেন, ভেতরের মানুষগুলো টিপটপ, গায়ে ভালো মানুষের গন্ধ, কুলিমুজুরের গামের গন্ধে নাক ছিটকায় না। বরং ভিখারিরা হাত পাতলে দশ টাকার নোট দিয়ে শরীর মুছে দেয়। বাজান আর আমি প্লাটফর্মে থেকে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখলাম। দেখে মনে হলো, এরা অন্যগ্রহের হরিহর আত্মার মানুষ। জীবনমান হয়তো আরও কয়েকটা এলাকার মানুষের চেয়ে একেবারে আলাদা। দুজনে দেরি করালাম না; ভাবতে ভাবতে দুজনে ট্রেনে উঠে পড়লাম।

কমলাপুর থেকে চট্টগ্রামের ট্রেন। সে আরেক দামী নগর। তবে মাঝে মধ্যে জলজটের খবর বানের বাতাসের মত উড়ে বেড়ায়। সেই নগরের নাম শুনে বাজান আঁৎকে উঠে বলল- দীনেশ! কোন নগরে আর যাইবার চাই না। তার বাজান যেতে রাজি হইলো না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। কোলাহলের নগরী ছেড়ে ছুটতে লাগল। স্টেশন আসে ট্রেনে এপাশে ওপাশে দু চারটে সিট খালি হয় দুজনে বসে; যাত্রী উঠলে হাতল ধরে ঝুলতে থাকে। এভাবে ঝুলতে ঝুলতে হঠাৎ ট্রেন ব্রেক কসলে গরগর যাত্রী নামতে লাগল। নিচ থেকে গানের সুর ধেয়ে আসল। জীবননামের রেলগাড়িটা পায়না খুঁজে স্টেশন। গানটা দীনেশের মনে ঠেঁসে গেল। অন্যদিকে পেটে বড্ড খিদে তাই এই স্টেশনে তারা নেমে পড়ছিল। নেমে দেখে অন্য এক দুনিয়া। মানুষের মধ্যে দু ভাগ। ভাগটা বেশ চোঁখধাধানোও বলা চলে। একভাগ মানুষ যারা নেমেই মেইন ফটক দিয়ে তড়িঘড়ি বেরিয়ে পড়ছে। অন্যরা পুটলি কাঁধে হাঁটা হাঁটি করছিল। দেখে মনে হচ্ছে দেশ পলাতক মানুষ। দেশে মাথা হেলানোর আল নেই। প্রাণ বাঁচাতে পথে নেমে পড়ছে। দীনেশ ও তার বাজানের চোখে ঘুম, তারা রাতের বিছানা ঠিক করতে ছুটছে ফ্লাটফর্মের বারান্দায়। বাপ ব্যাটা দুজনও তাদের ভিড়ে হাঁটতে লাগলো। অচেনা শহরে হিসাব করে পা পেলতে হয়। পায়ের গতি ও কথার ডেকুর শুনলে তারা আন্দাজ করে এরা নতুন মক্কেল। পাইছি বলে ধাওয়া করে। কথায় আছে না! জাতের লোকে জাত হজম করে না। তেমনি যে কারো চোখে পড়ে সন্দেহের তালিকাপত্রে তাদের নাম উঠতে পারে।

বিশাল ফ্লাটফর্ম। যারা আগে আসে লেমপোস্ট বা সোডিয়ামের নিচের জায়গাগুলো তাদের দখলে চলে যায়। এখানেও তার ব্যতিক্রম দেখা গেল না। হু…হু করে রাতের আকাশ বাড়তে লাগল। দীনেশ বাজানের হাত ধরে আশ্রয় খুঁজতেছিল। খালি জায়গা পেয়ে পুটলি থেকে ছাদর ছড়িয়ে দিলো হাজারো মানুষের পদধূলির উপর। আহ! কী অপূর্ব দৃশ্য। আশে পাশে লোকগুলো বিছানা গাড়ার আগে ধূলিতে চুম্বন দিয়ে বিছানা ছড়ায়। মানুষের পদধূলি স্টেশনের লক্ষ্মী। কারণ যতপদধূলি পড়বে কালোবাজারি এবং পাশাপাশি ভিখেরির পকেটে আধুলি জমা হবে। তাই দু হাত তুলে যার যার সৃষ্টিকর্তাকে সে সে নামে স্মরণ করতে করতে মুখে ফেনা উঠাতে লাগল। যেদিন কামাই কম হয় শ্রষ্টাকে গালি দিতেও ভুলে না। আজ অন্যদিনের তুলনায় ভিখেরি কম। তাই স্টেশন কিছুটা ফাঁকা নাহলে দীনেশ বিছানা রাখতে পারতো না। তবুও কী বিছানা রাখতে পারল!

বাপ ব্যাটা দুজনে মাথা ঠেকাল ফ্লোরের উপর। দীনেশ আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে সূদূরে তারাদের ঝিলিক। হঠাৎ একটা তারা খসে গেল। সেই তারার পেছনে পেছনে দীনেশের নজর ছুটছে। পায়ে কীসের লেজ লাগল, চট করে উঠে দেখলো কুকুর তার পায়ের কাছে পায়চারি করছে এবং গন্ধ নিচ্ছে তার। তাহলে কী কুকুরও নতুন অতিথি হিসেবে সনাক্ত করছে। কুকুর চলে গেল বাঁদিকে চোখ ফিরালো, দুজন লোক তাদের দিকে তাকিয়ে কী বলছে। দেখতে দেখতে তারা দুজন এগিয়ে এসে বলল- পুরান পাগলে ভাত পায় না নতুন পাগলের আমদানী। ঐ বাড়ি কই? দীনেশ উঠে বলল- কীরে ভাই! এ কেমন কথা। আমরা তোমাদের কী করলাম! একজন চেঁচিয়ে বলল- উঠ উঠ। আরেকজন চোখে ইশারা করলো – জনপ্রতি কেবিনভাড়া পঞ্চাশ টাকা। দিলেই মাথা রাখবি নচেৎ উঠে পড়। দীনেশ বলল এ আবার কী কথা এবং কেমন কেবিন! অন্যজন চোখ পাকিয়ে বলল- আরে এটাই কেবিন। তোমরা দুজন না! জলদি একশ টাকা দে! সময় কম। পরে টাকা দিবি উষ্টা খাবি ফ্রি। দীনেশ কুকুর ও তাদের মুখের ভঙ্গি বুঝতে চেষ্টা করল। কিন্তু প্রাণী কুকুরকে সমাজরদী মনে হয়েছিল। মানুষদুটোকে মনে হলো মানুষকুকুর। যাদের কামড়ের ভেকসিন মানুষতৈরি করতে পারেনি। মানুষযখন কুকুরের স্বভাব গায়ে মেখেছে ভদ্র হয়ে উঠেছে চারপাই কুকুর।

দীনেশের কাছে পঞ্চাশ টাকার দুটো নোট ছাড়া কোন টাকা নেই। বাজানের শরীর ক্লান্ত তাই একটা কেবিন নিয়ে বলল- আমি বসে থাকবো। বাজান ঘুমাবে। পঞ্চাশ টাকা নেন… দীনেশ পুটলি থেকে পঞ্চাশ টাকা বের করে তাদের হাতে তুলে দিলে তারা টাকার গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে চলে যায়। কিন্তু গাঁজার গন্ধে দীনেশের মাথার উপর দিয়ে উড়তে থাকে। দীনেশ নাক চেপে বলে বাজান চিন্তা কইরো না; দুনিয়ায় ঠাঁই পেতে ভগবানের পরীক্ষা চাই তাই দিতে হলো বৈ আর কিছু নয়। রাত বাড়তে লাগল – দীনেশ এদিক ওদিক তাকিয়ে ফ্লাটফর্মের উপর মাথা কাৎ করে। আবার মাঝে মধ্যে নজর রাখে যদি ওরা চলে আসে তাহলে বাকি পঞ্চাশ টাকাও খরচা হবে। তাই চোখকান খাড়া রাখে, অন্ধকারও খাড়া হতে হতে হেলে পড়ছিল।

ফজরের আজান। ডেমুট্রেনের হুইসেল বেজে উঠে। তার বাজানের ঘুম ভেঙে যায়। দীনেশের অল্পবিদ্যা আছে। যাতে নামদাম বানান করে করে পড়তে পারে। তাই ট্রেনের পাশে গিয়ে ঠোঁট খুড়িয়ে খুঁড়িয়ে নাম পড়ে নেয়। বাজানকে এসে বলল- বাজান এটা চাঁদপুর যাবে। দীনেশের বাজান মুখের ভাঁজ খুলে বলে উঠল। চাঁদ সওদাগরের দেশ চাঁদপুর। সেখানকার মানুষভালো হতে পারে। চল উঠে পড়ি। দেখতে দোষ কী? বাড়িঘর যখন ছাড়ছি। তখন আর পিছনে যামুনা। সামনেই চল। ট্রেনের শেষ হুইসেল শোনা গেল। দীনেশ বাজানের হাত ধরে ট্রেনে উঠল। ট্রেন লম্বা টান দিলো। ছোট ছোট বিরতি দিয়ে দিতে দিতে এগিয়ে গেল। সামনে হাজীগঞ্জ স্টেশন। দীনেশের চোখে ধরা পড়ল স্টেশনের নাম। হাজীগঞ্জ নামটা দেখে তার মনে ধরলো। লোক নামতে লাগল। সে বাজানকে বলল- বাজান এ স্টেশনের নাম হাজীগঞ্জ। তাই নাকি বাজান? হাজী নামটির সঙ্গে দীনেশ বেশ পরিচিত। সে তার বাবার মুখেই হাজী মুহম্মদ মহসীনের নাম শুনেছিল। যিনি অনেক দানবীর ছিলেন। হয়তো এখানকার মানুষও অনেক দানবীর। তাই বাবাকে নিয়ে নেমে পড়ল। দুটি দেহ চিটকে দিয়ে ট্রেন গন্তব্যের দিকে দৌড়াতে লাগল।

স্টেশনের সামনে পেছনে উজান বিল। রেল রাস্তার পাশে খালি জায়গা। একটু দূরেই তিন চারটে ঝুপড়ি। ঝুপড়ির পাশে পড়ে আছে খালি জায়গা । ইচ্ছা করলে কয়েকটা ঝুপড়ি তুলে মাথা গোঁজার ঠাঁই করা যায়। দীনেশ দেখেই বাজানকে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। প্রথম ঝুপড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘকায় লোক। মনে হলো তিনি ঝুপড়ি এলাকার শাসক। চোখে মুখে শাসকের ভঙ্গি। ব্রিটিশদের মত ভাবসাব তাঁর। তাদের দেখেই প্রমিত বাংলায় বলল- কী চাই? বাংলা বলার ভঙ্গি দেখে মনে হলো তার পূর্বপুরুষ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিল। দীনেশ ভয়ে ভয়ে তার সামনে দাড়িয়ে বলল- আশ্রয় প্রার্থনা করছি মহাশয়। লোকটি দীনেশের বাচনী দেখে কিছুটা ক্ষীণ হয়ে বলল- এটা বৃটিশপল্লী। বৃটিশরা চলে গেলে দেশের রেল পথে পথে পড়ে থাকা খালি জায়গা তাদেরই আশির্বাদ। এবং তাতে গড়ে উঠেছে ভাঙতি মানুষের ঘর। অতএব বৃটিশদের পল্লীতে ঘর বানাতে পারো কিন্তু কুকুর হইতে সাবধান!
দীনেশের চোখ বড় হয়ে গেল। অনেক আগেই সে প্রাণী কুকুরের ভয় হজম করেছে। শেষ হজম করেছিল শাসনগাছা স্টেশনে। সেই থেকে মানুষকুকুরের কথা শুনলে পেট মোছড় দিয়ে ওঠে। সাধন মিয়া কী কুকুরের কথা বলছে কেন? জানেনা সে। সাধন মিয়ার নতুন সঙ্গী দীনেশের বাবা। কথার মানুষও ছিল না। আজ দীনেশের বাজানকে পেয়ে দুজনে স্বাধীনতা যুদ্ধের কাহিনি বর্ণনা করতে লাগলো। দীনেশ ঝুপড়ি তুলতে আশে পাশে লাঠিচোঠা খুঁজতেছিল। খুঁজতে খুঁজতে মেইনরাস্তায় এসে দেখলো। বাজারে মানুষগিঁজগিঁজ করে। দামদস্তুরবিহীন মানুষসওদা করে ছুটে বেড়ায়। সামনে মালামালের ট্রাক। দোকানী মালামাল নামাতে লোক খুঁজতেছিল। দীনেশ এগিয়ে গেল এবং বলল- ভাইজান আমি নামিয়ে দেবো? দোকানী মুচকী হেসে বলল- তুমি পারবে? তাহলে হাত লাগাও। সে ছটপট নামিয়ে পেলল। দোকানী খুশি হয়ে হাজার টাকার নোট তার হাতে দিয়ে বলল- তোমার বাড়ি কই? দীনেশ চুপ করে রইল। আবার লোকটি দীনেশের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল- রোজই মালামাল নামবে। তুমি সময় থাকলে এসে পড়বে। দীনেশ পলিথিন, সুতলি এবং প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র কিনে বৃটিশপল্লীতে ফিরে এল। দীনেশের চোখে মুখে আনন্দ দেখে তার বাজান চমকে গেল। তাদের এক ভরাসংসার মানুষ ছিল। করোনার মহামারিতে সবাই জীবনছুটি গ্রহণ করেছিল। বেঁচে রইল দীনেশ। সে থেকে দীনেশই তার বাবার ভরসা। দেশে কামকাজ নেই তাই বাপ ব্যাটা ভিটেমাটি ছেড়ে চলে এলো। দীনেশের শরীরে খুব হিম্মত, রোজ কাম করে সে এবং মোটা মোটা টাকা কামায়। অল্প কয়দিনে ঝুপড়ি সাজায় সে। বাপ ব্যাটা দিনরাতে খেয়ে দেয়ে আনন্দে কাটাচ্ছিল।
সন্ধ্যাবেলা। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে রেললাইনের ওপারে পা বাড়ায় দীনেশের বাজান। ওপারেই সিগেরট খেতে খেতে হুক্কুর হুক্কুর কাঁশে সাধন মিয়া। দীনেশের বাজান ভরসা পায়। কাজ সেরে পা বাড়ায়। মেঘনা এক্সপ্রেস ডাকতে থাকে। দীনেশের বাজান দেখলো ট্রেন একটু দূরে তাই সামনের দিকে পা বাড়িয়েছিল। ট্রেনে কাটা পড়ল সে। রক্ষক্ষরণ হতে হতে প্রাণটা উড়ে গেল। দীনেশ পল্লীতে ফিরে দেখে বাজান ভিতরে নাই। কুপি জ্বলে না আজ। সে চারদিকে আলো খুঁজতে লাগলো। হঠাৎ চোখ পড়ল বাঁদিকে সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত কে পড়ে আছে রা শব্দও নেই। ঢলে আছে পাথরের উপর। মোবাইলের লাইট ধরলো দীনেশ। দেখে বাবার চিহৃ বিচ্ছিন্ন দেহ পড়ে আছে। সে সাধন মিয়াকে ডাকলো, সে সিগারেট টানতে টানতে পূব দিকের রেল পার হচ্ছিল, কিন্তু দীনেশের চোখেমুখে অশ্রুপ্রবাহ, সাধন মিয়া দেখে গাবড়ে গেলেও দীনেশকে বলল- জানাজানি করিস না। হজম কর! হজম কর! জানাজানি হলে বৃটিশ পল্লীতে পুলিশের মহড়া শুরু হবে। দেনদরবারে র জন্য হাতভর্তি টাকা দিতে হবে। কোথায় পাবে এত টাকা বরং কাপড় পেঁচিয়ে ট্রাক ভাড়া করে দেশের বাড়ি নিয়ে যাও। দীনেশের সন্দেহ হলেও মুখ খুলতে ভয় পায়। কারণ কী হয়েছে সে জানে না; এ মুহূর্তে তার ভরসাও সাধন মিয়া। মাথা ঠিক করতে পারে না। এ ফাঁকে পথচারী চলে আসে, সাধন মিয়া থরথর কাঁপতে থাকে। ব্রিটিশরা পলানোর সময় কেমন কেঁপেছিল কে জানে! দীনেশ বৃটিশপল্লীতে কাঁপাকাঁপি দেখতে দেখতে নিজেও ভয় পেয়ে গেল। পুলিশ চলে এল। নাম ঠিকানা নিয়ে পোস্টমর্টেম ব্যবস্থা করল। সাধন মিয়ার ভাবগতিক দেখে তাকে থানায় নিয়ে গেল। এবং টেস্ট করে দেখা গেল। সাধন মিয়া হাতের চাপ রয়েছে তার উপর। সাধন মিয়া ফেঁসে গেল। দীনেশ লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরল এবং গত কয়েকদিন আগেই দাহ হয়েছে তার। ধর্মের অনেক বিধিনিশেষ থাকা স্বত্তেও পালন করলো না। কারণ পেঠ তো ধর্ম বুঝে না। তাই স্বাভাবিক পোশাকে বাড়ি ছেড়ে স্টেশনে দাঁড়াল। দীনেশ হাই তুলে বলল- সাকু ভাই, পৃথিবীকি ধোঁয়াশা… ধোঁয়াশা…
সাকের আলী মনোযোগ দিয়ে শুনছিল তার কথা। মনে মনে স্থির করল- বউ বাচ্চা নিয়ে দীনেশের সাথেই চলে যাবে হাজীশহরের বৃটিশপল্লীতে। যেখানে কামাই করে মুখের খোরাক জোগাবে সে। তাই দীনেশকে বলল- দীনেশ এককথায় রাজী হয়ে গেল। সাকের আলী দীনেশকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল।
বাড়ির দরজায় পৌঁছতেই এগিয়ে এল মমেনা বেগম দীনেশকে দেখে চিনতে ভুল করল না; কারণ দোকানে যেদিন পাড়ার ছেলেরা মমেনাকে টিটকারি করছিল। সেদিন দীনেশের জোর প্রতিবাদে মমেনা বেঁচে গিয়েছিল। না হলে কপালে শনিরদশা ছিল। সাকের আলী মমেনাকে পরিচয় করালে মমেনা মুচকি হেসে বলল- উনি ভালো মানুষ। দীনেশ ভেলভেল করে মমেনার দিকে তাকিয়ে রইল।মনে মনে ভাবতে লাগল। শালা সাকের আলী কী মানুষ! এমন সুন্দরী বউ কার জিম্মায় রাইখ্যা গেরাম ছাড়ে সে।
মমেনা হিম্মত বংশের মাইয়্যা । উঠতিবয়সে পিরিতির জ্বালায় সাকের আলীর খপ্পরে পড়ে আজ ছন্নছাড়া জীবন পার করছে। বাড়িতে হাঁস মুরগী কয়েক জাতের। মোরগ ধরে রান্না করে সে। এবং খাবার পরিবেশন করে আর রাগ ঝাড়ে শাকের আলীর উপর। সাকের আলী বউ পাগল ছেলে মাথা কুড়িয়ে রাখে। যা বলে হাসিঠাট্টা করে উড়িয়ে দেয়। কোনদিকে তাকায় না। বউয়ের মুখের দিকে চোখ হেলিয়ে রাখে। তবে বউয়ের নামে কেউ মুখ উঠালে চৌদ্দগোষ্ঠির উদ্ধার করে।
দীনেশ মিটিমিটি হাসে। মমেনা জোর করে করে পাতে মোরগের পা তুলে দিলো। সে কড়মড় করে খেতে খেতে মমেনার প্রশংসা করতে থাকে। মমেনা প্রশংসা শুনে আঁচল গুজে গুজে হাসে… খাওয়া দাওয়া শেষ। সাকের মমেনাকে সব গুচাতে বলল- মমেনা প্রথম একটু আনমনা হলেও হাজীগঞ্জের কথা শুনে তড়িঘড়ি সব গুচাতে থাকে। এবং বলল- আমি কিন্তু কয়দিন থেকেই চলে আসবো। সাকের আলী মনে মনে ভাবে তাকে একা রাখা খুব রিস্ক। কারণ বর্তমানে চারদিকের খবর বেজায় খারাপ। হুড়হুড় করে তারা বাড়ি ছাড়ল। এবং বাস ধরে গাইবান্ধায় পৌঁছে গেল। বাজারে দাঁড়িয়ে দেশি বলে বেচে দিল মমেনার শখের হাঁসমুরগী। সামনেই রেল স্টেশন একটু পরেই ঢাকাগামী ট্রেন আসবে। সে ট্রেনে জীবনের প্রয়োজন মেটাতে পাড়ি দিবে সাকের ও তার স্ত্রী মমেনা বেগম। বাড়ির সংসার গুড়িয়ে নতুনভাবে গড়ে নিবে নিজেদের। ফ্লাটফর্মের ডেলচিতে বসে মমেনার হাত খুটিয়ে দেখছিল সাকের আলী। দীনেশ টিকেট নিয়ে তাদের খুঁনসুঁটি দেখে ঠোঁট কামড়াতে লাগল এবং ট্রেন আসল। দীনেশ মমেনার ব্যাগ নিয়ে উঠলে মমেনা পেছনে পেছনে উঠে গেল। সাকের আলী বউয়ের জন্য জল আর আচার আনতে নেমেছিল। এমন সময় ট্রেন ছেড়ে দিল। মমেনা বেগম ছটপট করতে লাগল। ট্রেন দৌড়াতে লাগলে মমেনা চিৎকার দিয়ে জানালায় বাহিরে মাথা রেখে সাকু…সাকু ডাকতে লাগল। বাতাসে তার বেনি খুলে গেল। সাকের ট্রেনের পেছনে পেছনে দৌড়াতে লাগল। মমেনা অজ্ঞান হয়ে দীনেশের গায়ের উপর হেলে পড়ল! দীনেশ মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে সাকেরের দৌড়ের গতিবেগ দেখছে এবং উড় চুল দেখে দেখে; ঘনঘন মমেনার দিকে তাকাতে লাগল…

 

লেখকঃ

শাহমুব জুয়েল
কথাসাহিত্যিক
সম্পাদক লিটলম্যাগ বর্ণিল, চাঁদপুর।