মার্কেটিং জগতে করোনা

মোঃ সুমন ডিবিবি

ফিচার ও মতামত ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯:৩৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৫, ২০২০ | আপডেট: ৯:৩৯:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৫, ২০২০ |

করোনাভাইরাস ইতিমধ্যে প্রায় অচল করে দিয়েছে লাখ লাখ বিজনেস, কোটি কোটি মানুষের জীবন হুমকির সম্মুখীন, সাথে চাকরি হারানোর আশংকা। খুব স্বাভাবিকভাবেই এর বিশাল প্রভাব আমরা অলরেডি দেখতে পাচ্ছি কনজিউমার বিহেভিয়ারে, বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে। ডিয়ার মার্কেটার্স, প্রশ্ন হচ্ছে, কিভাবে আমি আপনি সেই চেইঞ্জ এর জন্য নিজেকে তৈরি করতে পারি সময় থাকতেই?

অবশ্যই এই গ্লোবাল ক্রাইসিস এর শর্ট টার্ম এবং লং টার্ম প্রভাব আছে এডভারটাইজিংয়ের উপর। এখন পর্যন্ত অসংখ্য ইভেন্ট ক্যান্সেল হয়ে গিয়েছে, আমাদের দেশে মুজিব বর্ষ থেকে শুরু করে টোকিও অলিম্পিক, অনেক গুরুত্বপূর্ণ  স্পোর্টিং ইভেন্ট, কনফারেন্স, এবং আরো অনেক অনেক সামনে ক্যান্সেল হতে যাচ্ছে। আর সেই সাথে কমে গিয়েছে প্রায় সকল ধরণের ট্রেডিশনাল এবং ডিজিটাল মার্কেটিং এক্টিভিটিজ। এক্সপার্টরা বলছে ফেইসবুকের এড রেভিনিউ কমে আসবে অনেক। কিন্তু এগুলো তো শর্ট টার্ম বা মিড টার্ম, আমার ধারণা লং টার্মেও অনেক অনেক চেইঞ্জ আসবে বিজনেসগুলোতে, চেইঞ্জ আসবে ব্রান্ডিংয়ে, মার্কেটিংয়ে।

যেহেতু এখনই সব কিছু ধারণা করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়, আমি কয়েকটি পয়েন্ট তুলে ধরার চেষ্ঠা করছি যেগুলো আমার মতে বিশাল পরিবর্তন আসতে চলেছে। ডিজিটাল মার্কেটিং ছাড়িয়ে যাবে ট্রেডিশনাল মার্কেটিং এ:

করোনাভাইরাস  বাংলাদেশে প্রথম কিছু রোগী সনাক্ত করার পর থেকে অনেক ব্র্যান্ড সোশ্যাল অ্যাওয়ারনেসের উপর জোর দিচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি সেপনিল হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়ে স্কয়ারের কন্টেন্ট ব্র্যান্ডিং থেকে শুরু করে জিপির ‘স্টে হোম’ ডিজিটাল ক্যাম্পেইন। যেহেতু আমরা দেশব্যাপী ছুটি বা লকডাউনের কারণে ‘হোম টু হোম’ করছি, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, ভিডিও দেখা এগুলোও অনেক অনেক বেড়ে গেছে। সামনের দিনগুলোতে এবং দূরের ভবিষ্যতেও কিন্তু আমরা আগের থেকে অনেক বেশি সতর্ক থাকবো জনসমাগম এড়াতে।

ফলাফল? ডিজিটাল কন্টেন্ট অনেক অনেক গুণ বেড়ে যাবে। কোম্পানীগুলো আউট টু হোম  বা অন্যান্য বেশ কিছু ট্রেডিশনাল এডভার্টাইজিং এর বদলে ঝুঁকে পড়বে আরো বেশি ডিজিটাল এডভার্টাইজিংয়ের দিকে।

২। ইকমার্স এর প্রাধান্য:

করোনাভাইরাস এবং পরবর্তীতে এই জাতীয় সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য মানুষের জেনারেল টেন্ডেন্সি হবে পাবলিক প্লেস এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলা। এর ফলে কিন্তু রিটেইল শপ, সার্ভিস সেন্টারে কাস্টোমারের আনাগোনা কমে যাবে ব্যাপক হারে। বর্তমানে আমরা দেখতে পারছি অসংখ্য ইকমার্স এবং এস.এম.ই  এখন বিপর্যয়ের সম্মুখীন, বিশেষ করে সব ধরণের লাইফস্টাইল কিংবা অন্যান্য প্রোডাক্টে। তবে নিজেদের প্রোডাক্ট এবং প্রস্তাবগুলোকে ক্ষুদ্র করে হয়তো অনেকে টিকে থাকবে এই সংকটময় সময়ে এবং পরবর্তী মাসগুলোতে। সুতরাং গভর্মেন্ট এজেন্সি থেকে শুরু করে যেসব কোম্পানির পক্ষে সম্ভব, তারাই এখন থেকে চেষ্টা শুরু করবে তাদের প্রক্রিয়া উন্নত করে প্রোডাক্ট এবং সার্ভিস বাসায় পৌছে দিতে। বাংলাদেশে প্রধান শহরগুলির বাইরে ই-কমার্স এখনো ততটা জনপ্রিয় না, এবং লাস্ট মাইল ডেলিভারিতেও অনেক চ্যালেঞ্জ ফেইস করছে ইকুরিয়ার, পাঠাও, পেপারফ্লাই থেকে শুরু করে অন্যান্য ডেলিভারি কোম্পানিগুলো। কিন্তু A2i এর সহযোগিতায় তারাও এখন আরো বেশি রিসোর্স এলোকেট করবে লাস্ট-মাইল-ডেলিভারী এর জন্য।

 

৩। নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং দ্বায়িত্ববোধক মেসেজ:

আমরা দেখেছি বেক্সিমকো – আকিজ গ্রুপের মতো কোম্পানীগুলো এগিয়ে এসেছে মানবতার সেবায়। এরকম আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে আমাদের চারপাশে। প্রতিটা এক্টিভিটি আমাদের মনে পজিটিভ ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করছে, যা কিনা ব্র্যান্ড এসেট হিসেবে কাজে লাগবে সামনের দিনগুলোতে। যেহেতু আমরা ছোঁয়াচে ভাইরাস নিয়ে আগের থেকে শত গুণ সচেতন, প্রতিটা ব্র্যান্ডকে প্রায়োরিটি দিতে হবে কাস্টোমার সেফটি মেজারমেন্টের উপর। শুধু স্টেপ নিলেই হবে না, সেগুলো আবার ঠিকমত জানাতে হবে কাস্টমারকে। সুতরাং এখন থেকে প্রতিটা ব্যান্ডকে কাস্টোমার এবং এমপ্লয়ী সেফটি নিশ্চিত করতে হবে এবং একটা কোর ভ্যালু হিসেবে সঠিকভাবে কনভেয়ও করতে হবে তাদের মার্কেটিং চ্যানেলগুলোতে।

 

৪। কাজের পদ্ধতিগত পরিবর্তন:

ওয়ার্ক-ফর্ম-হোম কিন্তু আগামী এক দুই সপ্তাহে কিংবা মাসেই শেষ নয়, এই কাজের ক্ষেত্রে অনেক বড় একটা পরিবর্তন আসবে এই সংকট এর কারণে। অদূর ভবিষ্যতে নতুনত্ব  আসবে ম্যানুফ্যাকচারিং প্রক্রিয়ায়, প্রাধান্য পাবে রোবটিকস এর মতো টেকনোলোজি। একইভাবে অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিগুলোও আস্তে আস্তে এমন প্রক্রিয়া ডেভেলপ করতে চেষ্টা করবে যেন ভবিষ্যতে এরকম কোন সংক্রামক রোগ আসলেও কোন কিছু বন্ধ না থাকে। বদলে যাবে প্রতিদিনের বাসা-অফিস-বাসা যাতায়াতের পদ্ধতি। আর সেজন্য  কোম্পানিগুলোকে নতুন করে চিন্তা করতে হবে প্রোডাক্ট এবং সার্ভিস নিয়ে। আপনার টার্গেট গ্রুপ যদি রিমোট ওয়ার্ক-এ শিফট করে, সেক্ষেত্রে আপনার অফারিং, ব্র্যান্ডিং এবং মার্কেটিং মেসেজও একইভাবে শিফট করতে হবে ন্যাচারালি।

 

৫। অনলাইন দুনিয়া:

করোনা ভাইরাসের জন্য অনলাইন খাতগুলো হয়ে উঠবে সম্ভাবনাময়ী। ফেইসবুক ঝাঁপিয়ে পড়বে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রজেক্টে, গৃহবন্দী মানুষদের বেটার অপশন দেবার আশায়। আর এসব কিছুর ফলাফল? মার্কেটিং টেকনোলোজি এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স এসিস্টেড এডভারটাইজিংয়ের প্রতি কোম্পানীগুলোর অনেক বেশি নির্ভরশীল হওয়া, যেন ডিজিটাল প্লাটফর্মে সঠিক কাস্টোমারকে সঠিক সময়ে সঠিক প্রোডাক্ট/সার্ভিস অফার করা যায়।

সুতরাং কোম্পানীর এখনই সঠিক সময় বিশেষত্ব খাতগুলোর দিকে নজর রাখা।

করোনাভাইরাস আমাদের সবার জন্য একদম নতুন অভিজ্ঞতা এবং ক্রাইসিস, যে কারণে  আমরা শুরুতেই ভাইরাসটির সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য সময়োপযোগী অনেক পদক্ষেপই নিতে পারিনি। কিন্তু এখন আমরা শিখছি তা থেকে খুব দ্রুতই আমরা আবিষ্কার করে ফেলতে পারনো কিভাবে এরকম সংক্রামক ভাইরাস এর সাথে লড়াই করতে হয়। আর এখনই উপযুক্ত সময় স্বাস্থ্য-সুরক্ষার পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর শর্ট টার্ম এবং লং টার্ম মার্কেটিং স্ট্রাটেজি নিয়ে কাজ করার। এই সমস্যা থেকে রাতারাতি মুক্তি পাবার কোন উপায় হয়তো আমাদের হাতে নেই, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা আমাদেরকে সাহায্য করবে এই সংকট এর ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনতে।

করোনা ভাইরাসের এই পরিস্থিকে আমলে নিয়ে যারা সঠিক নীতি সাজাতে পারবে তারাই টিকে যাবে।

 

লেখক:

মোঃ সুমন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

মার্কেটিং বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।