রাজার বাড়ির আঙ্গিনায় একদিন

প্রকাশিত: ১০:০৯ অপরাহ্ণ, মে ১, ২০১৯ | আপডেট: ১০:১১:অপরাহ্ণ, মে ১, ২০১৯ |

এই চেয়ারটিতে বসেই একসময় বিশাল ভূখন্ড শাসন করেছে দিঘাপতিয়া রাজবংশের দয়ারাম থেকে প্রতিভানাথ রায় পর্যন্ত অনেক রাজা। আজ আমরা তার সামনে দাড়িয়ে আছি। পরশ বুলিয়ে অনুভূতি নেওয়ার চেষ্টা করছি। রোমন্থনে ফিরে যেতে চাইছি তিন শত বছরেরও বেশী পিছনে।
ভাবতেই অবাক লাগছে আজকের এই নির্জন বাড়িটিই ছিল একসয়ের কোলাহলপূর্ন সাড়ম্বর রাজপ্রাসাদ। রাজা, রানী, প্রজা, ভৃত্যে সদাই ব্যস্ত থাকত এর প্রতিটি প্রাঙ্গন। তারা আজ না থাকলেও ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদটি আজও আছে। আছে তাদের ব্যাবহারের সামগ্রীগুলোও। আর সেসব ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো দেখতেই রাজ বাড়ির আঙ্গিনায় আমাদের পদচারণা।

বলছিলাম নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি তথা বর্তমান উত্তরা গণভবনের কথা। সাড়ে ৪১ একর জায়গার উপর দাড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের দর্শণীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম তিনশত বছরেরও বেশী প্রাচীন এই রাজবাড়িটি। ঐতিহ্যবাহী এই প্রাসাদটি দর্শনের জন্য এর আঙ্গিনায় উপস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ এন্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

বিভাগের বার্ষিক শিক্ষাসফরের জন্য এবার নির্ধারণ করা হয় নাটোর শহর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরের এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে।
১২ এপ্রিল সকাল সাড়ে আটটায় ক্যাম্পাস থেকে নাটোরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বাস। বাসে বিভাগের তিনজন শিক্ষকের দিকনির্দেশনায় প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের ৭৫ জন শিক্ষার্থী, কর্মকতা ও অতিথিসহ মোট ৮৫ জন জ্ঞানপিপাসু প্রাণকে নিয়ে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পিচঢালা কালো পথে এগিয়ে যায় বাসগুলো। বাসে উঠার পরপরই সাউন্ডবক্সের গানের তালে আনন্দে মেতে উঠে সবাই। গাড়ি বিরতিহীনভাবে এগয়ে যায় রাজার বাড়ির উদ্দেশ্যে। সকালের খাবার সেরে নেওয়া হয় গাড়িতেই।

যাত্রাপথে চোখে পড়ে মহাসড়কের দুইপাশে সারি সারি আমগাছ। সবে ধরা আমসহ গাছগুলো পথের সৌন্দর্য অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। পথের দুপাশে এরকম সারিবদ্ধ আমগাছ দেখে সত্যিই মুগ্ধ হতে হয়। মুগ্ধ দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম বাইরের দিকে। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম কখন যেন গান থেমে গেছে। সবার দৃষ্টি বাইরে। প্রকৃতির রুপে চোঁখ জুড়িয়ে নিচ্ছে সবাই।

দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে আমরা পৌঁছলাম কাক্সিক্ষত গন্তব্যে। গাড়ি থামল একদম রাজবাড়ির ফটকের সামনে। বাইরে থেকেই চোখে পড়ল বিশাল ফটক। ভিতরে প্রবেশের জন্য তর সইছিল না। প্রবেশ পথের ফটকটি আসলে একটি বিরাটাকৃতির পাথরের ঘড়ি। ঘড়িটার পাশে বড় ঘন্টাও। জানা যায় রাজা দয়ারাম ইংল্যান্ড থেকে আনিয়েছিলেন এই ঘড়ি ।

স্যার ম্যামদের সাথে গণভবনে প্রবেশ করলাম সবাই। ভিতরে ঢুকেই মনে হলো এ যেন এক সবুজ চত্বর। প্রাসাদের পুরো এলাকা জুড়ে বিভিন্ন রকমের গাছের সমারোহ। ফলজ, বনজ, ঔষধীসহ অনেক প্রাচীন দূর্লভ গাছ ও সৌন্দর্য বর্ধক ব্রাউনিয়া ও ককেসিয়া বৃক্ষে সজ্জিত প্রাসাদের প্রতিটি প্রাঙ্গন। নাম না জানা কিছু গাছের ফুল দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আমগাছগুলোতে ছোট ছোট আম ধরে আছে। প্রতিটি গাছের সাথে রয়েছে ফুল বা ফল না ছেড়ার জন্য সতর্কবানী সম্বলিত পোস্টার।

ভিতরে ঢুকতেই শুরু হলো নিজেদের মতো করে গ্রুপ ভিত্তিক ঘুরাঘুরি। সেই সাথে চলছে সেলফি আর ফটোগ্রাফি। প্রথমেই চোঁখে পড়ল রাজবাড়ির বিশালাকৃতির কামান। সবাই কামানের সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে চললাম অন্যদিকে। বিশাল প্রাসাদের পুরো এলাকা ঘোরা সম্ভভ না। তাই গুরুত্বপূর্ন জায়গাগুলো ঘুরে দেখছি সবাই।

প্রাসাদের পুরো এলাকায় গোলপুকুর, পদ্মপুকুর, শ্যামসাগর, কাছারিপুকুর, কালীপুকুর ও কেষ্টজির নামে ছয়টি পুকুর আছে। পুকুরের সানবাঁধানো ঘাটগুলো প্রাসাদের ঐতিহ্য বহন করছে। প্রাসাদের বামপাশে পুকুর ধারে গিয়ে দেখতে পেলাম দৃষ্টিনন্দন বাগান। বাগানে বিভিন্ন ধরনের ফুলের সমাহারের মধ্যে ফুটে থাকা সূর্যমুখী ফুলের সারিগুলো দেখে চোঁখ জুড়িয়ে যায়।

প্রাসাদের বাইরের এলাকা ঘুরে ১৫ টাকা মূল্যের টিকিট নিয়ে প্রবেশ করলাম উত্তরা গণভবন সংগ্রহশালায়। উত্তরা গণভবনের পুরাতন ট্রেজারিভবনে ২০১৮ সালের মার্চে এই সংগ্রহশালাটি স্থাপিত হয়। অতীতের সাথে বর্তমানের মেলবন্ধন তৈরী করেছে এই সংগ্রহশালাটি। সংগ্রহশালার করিডোরে রয়েছে রাজা প্রমাদানাথ ও সস্ত্রীক রাজা দয়ারামের ছবি ও রাজবাড়ির সংক্ষিপ্ত বিবরন।

সংগ্রহশালায় গিয়ে দেখা মিলল রাজ সিংহাসন, রাজার মুকুট, গাউন, পালঙ্ক, ঘুর্ণায়মান চেয়ার, টেবিলসহ রাজপরিবারের ব্যাবহারের অনেক জিনিস। সেই সাথে আছে ব্যাক্তিগত ডায়েরী, আত্মজীবনী, পান্ডুলিপি ও অনেক চিঠি।

সংগ্রহশালা থেকে বের হয়ে হয়তো চলেই আসতাম। কিন্তু জানতাম না তখনো অনেক কিছুই দেখার বাকি ছিল। প্রাসাদের মূল ভবনটি সর্বসাধারণের পবেশ থেকে সংরক্ষিত করে রাখা। আমাদের সাথে থাকা একজন সরকারী কর্মকর্তার অনুরোধে সৌভাগ্যক্রমে আমরা কয়েকজন প্রবেশের সুযোগ পেলাম। বিতরে ঢুকে রাজপ্রাসাদের মূল এই অংশ দেখে অবাক হয়েছি সবাই। ভবনের কেয়ারটেকার ঘুরে ঘুরে দেখালেন রাজদরবার, মিলনায়তন, শয়ন কক্ষ, বিশ্রামকক্ষ, বিনোদন কক্ষসহ সবগুলো কামারা। সেই সাথে বর্ণনা করে শোনালেন প্রতিটি কামরার ব্যাবহার সম্পর্কে। প্রতিটি কক্ষেই দিনের বেলায় সূর্যের আলো প্রবেশের দারুন ব্যাবস্থা রাখা হয়েছে। গণভবনের একটি সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য অংশ ইতালিয়ান গার্ডেন। ইতালি থেকে আনা এর আসবাবগুলো দেখে মুগ্ধ হতে হয়। এখানে আছে মার্বেল পাথরের বিভিন্ন মূর্তি। প্রাসাদের একটি অতুলনীয় অংশ রানীর টি-হাউস।

ঐতিহ্যবাহী এই স্থানের অনেক কিছু দেখে বের হলাম গণভবন থেকে। বেরিয়ে গাড়িতে কয়েক মিনিটের দুরত্ব পেরিয়ে পৌছঁলাম একসময়ের নাটোরের জমিদার রানী ভবানীর রাজবাড়িতে। ১২০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত প্রাসাদটি ছোট তরফ ও বড় তরফে দুইভাগে বিভক্ত। পুরো সবুজ জায়গাটিতে ছোট-বড় মোট ৮টি ভবন ও ৭ টি পুকুর রয়েছে। অনেক ভবন অব্যাবহৃত ও দেখভালের অভাবে নষ্ট হতে বসেছে।

মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা ছিল রাণী ভবানীর রাজবাড়িতেই। দুপুরের খাবারের পর প্রাসাদ ঘুরে প্রাসাদের চত্বরে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দুই বর্ষের শিক্ষার্থী ও অতিথিদের অংশগ্রহনের জমকালো সাংস্কৃতিক পর্বের মাধ্যমে শেষ হয় এবছরের বার্ষিক শিক্ষাসফর। সন্ধ্যার কিছুটা আগে সারাদিনের প্রচুর অভিজ্ঞতায় নিজেকে অনেকটা সমৃদ্ধ করে আবারো যাত্রা করলাম ক্যাম্পাসের পথে। গাড়ির গতির সাথে বাড়তে লাগল পেছনে ফেলে আসা ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ি ভ্রমনের স্মৃতিগুলোর দূরত্ব ।