লুজান চুক্তির সমাপ্তি এবং অটোমানদের পুনরুত্থান

অপি করিম ডিবিবি

ফিচার ও মতামত ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪:১৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২০ | আপডেট: ৪:১৩:অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২০ |

পৃথিবীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেওয়া এক চুক্তির নাম লুজান চুক্তি। লুজান চুক্তির ফলেই স্বীকৃতি পায় কামাল আতার্তুক পাশার সেকুলার তুরস্ক এবং বিলুপ্তি ঘটে হযরত আবু বকর (র) এর সময় থেকে সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসা খেলাফতের।মুসলিমরা চলে যায় ইতিহাসের সবচেয়ে কোণঠাসা অবস্থায়। এই চুক্তিটি সাক্ষরিত হয় ২৪শে জুলাই,১৯২৩ সালে সুইজারল্যান্ডের লুজান শহরে।শহরের নামানুসারে চুক্তিটির নাম হয় লুজান চুক্তি। ১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত অটোমান সাম্রাজ্য ও অপরদিকে বিজয়ী ফ্রান্স,যুক্তরাজ্য, ইতালিসহ অন্যান্যদের মধ্যে ১৯২০ সালে সাক্ষরিত হয় সেভ্রেস চুক্তি। কিন্তু তুরস্কের স্বাধীনতা আন্দোলনের ফলে চুক্তিটি ভেস্তে যায় এবং ১ম বিশ্বযুদ্ধের সর্বশেষ চুক্তি হিসেবে তার জায়গায় সাক্ষরিত হয় লুজন চুক্তি।

চুক্তিটি সাক্ষরকারী দেশগুলো হলোঃ তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স,ইতালি,জাপান,রোমানিয়া, গ্রিস,কিংডম অব সার্ব,ক্রুয়েট এন্ড স্লোভেন্স। চুক্তিটিতে ১৪৩ টা অনুচ্ছেদ রয়েছে। যার মধ্যে প্রধান অনুচ্ছেদ গুলো হলোঃ
১:খেলাফত বিলুপ্ত করা।
২: সেকুলার তুর্কি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
৩: জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।দেশের ভিতরে বা বাইরে কোন স্থানেই তুরস্ক তেল,গ্যাস উত্তোলন করতে পারবে না।
৪: তুরস্কের সীমানাভুক্ত বসফরাস প্রণালী সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং বলা হয় তুরস্ক এখান থেকে কোনো টোল আদায় করতে পারবে না।
৫: মক্কা,মদিনা উসমানীয় সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে ছিল।তাদের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া হয় এবং বলা হয় পরবর্তী একশো বছর তুরস্ক প্রশাসনিকভাবে আরব অঞ্চলে অগ্রসর হতে পারবে না।

তুরস্কের জাতির জনক কামাল আতার্তুক পাশা ১৯২৭ সালে তাঁর দেওয়া এক ভাষণে লুজান চুক্তিকে অটোমান ইতিহাসে এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক বিজয় বলে অভিহিত করেন।
খলিকা হযরত আবু বকর (র) এর সময় থেকে পরবর্তী ১৩শ বছর একটানা খেলাফত চালু ছিল। নানা উত্থান, পতন আসলেও খেলাফত টিকে ছিলো। কিন্তু পশ্চিমারা এই চুক্তিতে খেলাফত বিলুপ্তির শর্ত জুড়ে দেয় এবং কামাল পাশা তা মেনে নেয়। ফলে খেলাফতের অবসান ঘটে, ইতিহাসে মুসলিমরা সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থার সম্মুখীন হয়। উসমানীয় খেলাফত অবসানের সাথে সাথে উসমানীয় বংশের উত্তরাধিকারীদের সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং তাদের জোরপূর্বক নির্বাসনে পাঠানো হয়।

শর্তমতে তুর্কিতে একটি সেকুলার রাষ্ট্র গঠন করা হয়। আরবিতে আযান নিষিদ্ধ করা হয়। ল্যাটিন অক্ষরে তুর্কি লেখা শুরু হয় যা পূর্বে প্রায় আরবি বর্ণমালার মত ছিলো। সেকুলারিজমের নামে প্রায় সকল পশ্চিমা সংস্কৃতির আমদানি করা হয়। জনসম্মুখে হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়। ইসলাম চর্চা ও শিক্ষার উপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

একটি দেশের অর্থনীতিতে জীবাশ্ম জ্বালানির গুরুত্ব ও ভূমিকা কতোটুকু তা অপেক্ষা রাখে না। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ যেখানে শুধু মাত্র খনিজ তেল দ্বারাই ফুলে ফেঁপে উঠেছে সেখানে একটি দেশের জীবাশ্ম জ্বালানি থাকার পরেও তা নিষেধাজ্ঞার কারণে উত্তোলন করতে না পারাটা তার অর্থনীতিতে যে কতোটা বাজে প্রভাব ফেলে তা আমরা অনুধাবন করতে পারি। ২০১৯ সালের হিসেব মতে তুরস্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এক শতাংশেরও কম । আর তুরস্কের অর্থনীতি খুব বড় নয়, এখনো তাদের সম্ভাবনাময় ধরা হয়। ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণ সাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী বসফরাস প্রণালী এশিয়া – ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য পথের প্রধান রাস্তা।এই দুই মহাদেশের মধ্যে জাহাজ দ্বারা সংগঠিত হওয়া বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই এপথে হয়। তুর্কির সীমানার ভিতরে বসফরাস হলেও এখান থেকে কোনো টোল তারা আদায় করতে পারে না। এতবড় দুটি ক্ষত তুরস্কের অর্থনীতি গত একশো বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে। তুরস্কের অর্থনীতির মূল শক্তি যেগুলো হওয়ার কথা ছিলো তাই তারা গত ৯৭ বছর ধরে ব্যবহার করতে পারছে না। পশ্চিমারা সুপরিকল্পিতভাবে তুরস্ককে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রাখার জন্যই এই শর্ত আরোপ করে।

বসফরাসের সামরিক গুরুত্বও অপরিসীম। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত হওয়ায় এর সামরিক কৌশলগত গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কারণ এটা পৃথিবীর প্রায় মধ্যভাগে অবস্থিত। ১৯৩৬ সালে মনটিক্স চুক্তিতে এর কিছু পরিবর্তন এনে বলা হয় তুরস্ক কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলের দেশগুলো ব্যতীত বাকি সব দেশের নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

অটোমান সাম্রাজ্য তার শেষের দিনগুলোতেও প্রায় সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার উত্তরাঞ্চল ও বলকানের কিছু অংশ নিয়ে তাদের আয়তন ছিল প্রায় আঠারো লক্ষ বর্গকিলোমিটারের মতো। কিন্তু তুরস্কের কাছ থেকে লুজান চুক্তিতে এই অঞ্চলগুলোর কর্তৃত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। চুক্তি অনুয়ায়ী অর্ধেকেরও অনেক কম হয়ে যায় আধুনিক তুরস্কের আয়তন । কারণ এই চুক্তির ফলে তুরস্ক তার মধ্যপ্রাচ্যে ও আফ্রিকার উত্তরাঞ্চলে থাকা বড় বড় প্রদেশগুলো হারিয়ে ফেলে। চুক্তিমতে তুরস্ক পরবর্তী একশো বছর এসব অঞ্চলে প্রশাসনিকভাবে এগোতে পারবে না। কিন্তু লুজান চুক্তির মেয়াদশেষে তুরস্ক আবার এসব অঞ্চলে প্রশাসনিকভাবে কাজ চালানো শুরু করতে পারবে। কিন্তু বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার উত্তরাঞ্চলে অনেকগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের নিজস্ব সরকার রয়েছে। তারা নিশ্চয়ই আবারো তুরস্কের অধীনে যেতে চাইবে না। অটোমান সাম্রাজ্য আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হোক সেটাও নিশ্চয়ই তারা চায় না। তাই এসব অঞ্চলে তুরস্ক আবার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে,তাদের ভূমি পুনরায় পেতে চাইলে যুদ্ধ ছাড়া বিকল্প নেই। তার সাথে রয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চাপ। তবে তুরস্কও বসে নেই। তুরস্ক এসব অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর সাথে তার কৌশলগত সম্পর্কের উন্নয়ন করেছে।সিরিয়া,লিবিয়া, সোমালিয়াতে তাদের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। ন্যাটো বলয়ের বাইরে চীন, রাশিয়ার সাথে তুরস্কের রয়েছে খুবই ভালো সম্পর্ক। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করে তাদের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। মুসলিম দেশগুলোতে তুরস্কের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে বর্তমানে এরদোয়ান বদ্ধপরিকর। অটোমানদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার এবং তুরস্ককে পরাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে এরদোয়ান কাজ করে যাচ্ছে। ২০২৩ সালে লুজান চুক্তির মেয়াদ শেষে পৃথিবী দেখবে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ। তুরস্কের অর্থনৈতিক,সামরিক সক্ষমতাও সেইসাথে বৃদ্ধি পাবে। তুর্কিরাও হয়তো তিনমহাদেশে রাজত্ব করা অটোমানদের আর্বিভাবের সাথে মুসলিম খেলাফতের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রার্থনা করছে!

 

 

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।