শতবর্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

বাহাউদ্দীন বাহার ডিবিবি

ফিচার ও মতামত ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯:১৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৭, ২০২১ | আপডেট: ৯:১৩:অপরাহ্ণ, মার্চ ১৭, ২০২১ |

বঙ্গবন্ধুকে শুধু “বঙ্গবন্ধু” বললে তিনি অপূর্ণ থেকে যান। তিনি ছিলেন বিশ্ব মানবতার বন্ধু। তিনি ছিলেন বিশ্ববন্ধু। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাডওয়ার্ড হিথ বলেছিলেন, “পৃথিবীতে মানুষ যতদিন পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে ততদিন এই ভাষণ প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে। মানুষের সংগ্রাম আজও চলমান। শোষণের বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রাম যতদিন থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু উজ্জ্বল সূর্যের মত জ্বাজ্জল্যমান থাকবে।

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ মাতৃকার জন্য যে অনবদ্য অবদান রেখেছেন তা অনস্বীকার্য। অগ্নিঝরা ভাষণ ও আপোষহীন দৃঢ় মনোবল নিয়ে বাঙালির স্বপ্নে লালিত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে বাংলার মাটি ও মানুষের হৃদয়ে আর ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি। বাংলার পাখির গানে, বাতাসের উচ্ছ্বাসে, আকাশের নীলে, জারি-সারি ভাটিয়ালির সুরে, বৈশাখের ভৈরবীতে, বাঙালির হাসি-কান্নায় এবং মিলন-বিরহে আজও তিনি জাগ্রত। নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগই ছিল তার একমাত্র ব্রত।
শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের ১০ মাসের মধ্যেই বাঙালির জন্য রচনা করেছিলেন অসাধারণ সংবিধান। সেই সংবিধানে বাঙালির সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য পুরো কাঠামোকেই ঢেলে সাজানো হয়েছিলো। একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন মানবিক ‘সোনার বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। মুজিব চরিত্র মাধুর্য্যে ফুটে ওঠে আপোষহীনতা। আমৃত্যু অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে আলোর দিশারী মুজিব ছিলেন আপোষহীন। বাঙালি জাতির এই অবিসংবাদিত নেতার দৃঢ় সংকল্প, আত্মবিশ্বাস ও কঠিন আত্মত্যাগের ফলস্বরূপ আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকের মর্যাদা পেয়েছি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি, বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক ও জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে বছরজুড়ে পালিত নানা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক, সরকার প্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বাংলাদেশে আসবেন এবং নানা কর্মসূচিতে যোগ দেবেন।
বিখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট একবার বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন- ’হোয়াট ইজ ইউর কোয়ালিফিকেশন’? বঙ্গবন্ধু সাথে সাথে উত্তর দিয়েছিলেন, ’আই লাভ মাই পিপল’। তারপর ফ্রস্ট আবার প্রশ্ন করলেন, ’হোয়াট ইজ ইউর ডিসকোয়ালিফিকেশন’? বঙ্গবন্ধু বললেন, ’আই লাভ দেম টু মাচ’। বঙ্গবন্ধুর এ কথার মাধ্যমে বোঝা যায় যে তিনি মানুষকে কতটা ভালোবাসতেন। ১৯৭৩ সনের ৯ সেপ্টেম্বর আলজিয়ার্স জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত। শাসক ও শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।” পৃথিবীতে যতদিন শোষণ থাকবে, শোষিত মানুষ থাকবে বঙ্গবন্ধু ততদিন প্রাসঙ্গিক থাকবেন।

বঙ্গবন্ধু নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা কখনোই চিন্তা করেন নি। সম্পদ বলতে এক বাড়ি ছাড়া তার কিছুই ছিল না। তিনি ছিলেন নির্লোভ, নির্মোহ একজন মানুষ। ইচ্ছা করলে অনেক সম্পদের মালিক তিনি হতে পারতেন। আমরা জানি যে জাতির পিতা যখন জেলে থাকতেন তখন সংসার চালানোর জন্য বঙ্গমাতাকে প্রায়ই হিমসিম খেতে হতো। এমনকি তাকে স্বর্ণালংকার পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। এ পরিবারের জীবন যাপন ছিল একদম সাদামাটা, কোন প্রকার বিলাসিতা বা আত্ম-অহংকার তাদের ছিলো না। সকল ধরনের মানুষের যাতায়াত ছিল ৩২ নম্বরে।
সাধারণ মানুষকে ভালোবাসতেন বলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্তুথশ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য ১৯৪৯ সনের ২৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এক চরমপত্র দেয়। তাকেসহ পাঁচজনকে পনের টাকা জরিমানা দিয়ে এবং অভিভাবক মারফত মুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব রক্ষার জন্য বলা হয়। কিন্তু আজন্ম প্রতিবাদী ও আপসহীন বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সিদ্ধান্ত ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন । কিন্তু কর্মচারীদের দাবি আদায়ের আন্দোলন থেকে সরে না আসায় ১৯৪৯ সনের ১৮ এপ্রিল তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র হিসেবে বহিষ্কার করা হয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “সাত কোটি বাঙালির ভালবাসার কাঙাল আমি। সব হারাতে পারি কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভালবাসা হারাতে পারবো না। তিনি বলেছিলেন, “আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম, বলেছিলাম আমি বাঙালি আমি মানুষ, আমি মুসলমান। মুসলমান একবার মরে দুই বার মরে না। আমি বলেছিলাম আমার মৃত্যু আসে যদি আমি হাসতে হাসতে যাবো, আমার বাঙালি জাতকে অপমান করে যাবো না, তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইবো না।”
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে এই বাংলাদেশের আছে নানা অর্জন, আছে নানা চ্যালেঞ্জ। মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল দেশের তরুণ সমাজ। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে, গড়ে তুলেছে ‘মুজিব বাহিনী’। ধ্বংস করেছে হানাদার বাহিনীর একের পর এক পরিকল্পনা। এনে দিয়েছিলেন গৌরবময় বিজয়। দিয়েছে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার প্রত্যয়। কষ্টার্জিত এই বিজয় তাই আমাদের অস্তিত্ব, এগিয়ে যাবার প্রেরণা। কোনভাবেই অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই মহান মুক্তিযুদ্ধের। বর্তমান প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক সেই চেতনা আর দেশান্তবোধ। আর আমাদের বিজয় সেদিনই সফল হবে, যেদিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা বাংলার ১৬ কোটি মানুষের মুখ হাসি ফুটাবে। সেদিন থাকবে না কোনো দুর্নীতি, থাকবে না কোনো অনাহারী, থাকবে না অশিক্ষিত মানুষ। পৃথিবীর মানচিত্রে লাল সবুজের বাংলাদেশ হবে নবজাগরণে উদ্দীপ্ত বাংলাদেশ। বিজয়ের সমুন্নতায় সামগ্রিকভাবে আমাদের আরো অনেক বেশি তৎপরতা প্রয়োজন। সর্বোপরি স্বাধীনতার সম্পূর্ণ সুফল পেতে আমাদের একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে, নিজেদের অধিকার নিয়ে সচেতন হতে হবে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালনে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সার বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লাখ লাখ বাংলাদেশিও নানাভাবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর নানা আয়োজনে একাত্ম হবেন। অর্থাৎ বলা যায় বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী একটি ‘বৈশ্বিক ইভেন্ট’। মুজিববর্ষ সারা বিশ্বের সামনে বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি আর এর মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে নতুন করে চেনানোর একটি বড় উপলক্ষ হতে পারে। জন্মশতবার্ষিকী তে বঙ্গবন্ধু যে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অশিক্ষামুক্ত এবং শোষণ-বঞ্চনাহীন সমাজ, অশিক্ষা ও দারিদ্র্য দূর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সঠিক পথেই রয়েছে।

বাহাউদ্দীন বাহার
সাবেক ছাত্রনেতা ও মানবিক-উন্নয়ন কর্মী
baharcou2009@gmail.com