শিশুশ্রম ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

জাফরুল ইসলাম

শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: ৯:১৩ অপরাহ্ণ, জুন ২৪, ২০২১ | আপডেট: ৯:১৩:অপরাহ্ণ, জুন ২৪, ২০২১ |

বাংলাদেশের সংবিধান দেশের নাগরিকদের জন্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে। এসব মৌলিক অধিকার গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষার অধিকার। আর এই শিক্ষার অধিকার তখনই নিশ্চিত হবে যখন দেশের শিশুদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া নিশ্চিত করা যাবে। আজ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন যাবত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলার কোনো সম্ভাবনা এখনো হয়ে ওঠেনি। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকার ফলে তার একটা প্রভাব দেশের শিশুশ্রেণী, যারা পড়াশোনার সাথে সংযুক্ত ছিল তাদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। আমরা জানি বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের আর্থিক অবস্থা শোচনীয়। একটা হিসাবে দেখানো হয়েছে দেশের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এই শ্রেণীর মানুষ গুলোই তো আজ তাদের সন্তানদেরকে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠিয়ে দিচ্ছে। কারণ এদেশে একজন মানুষ যদি না খেয়ে মারা যায় তাকে দেখার মত কেউ নেই। যার পরিপ্রেক্ষিতে আজ দেশের সম্ভাবনাময় শিশুগুলো বিভিন্ন কাজের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ছে। যাদের যাদের কাছ থেকে দেশ কিছু আশা করে সেখানে তারা আজ দেশের কাছ থেকে অনেক কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে। আজ বাংলাদেশের হোটেল, ওয়ার্কশপ, কারখানা, নির্মাণ কাজে দেখতে পাই শিশুদের অবাধ পদাচরণ। এই শিশুরা এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সাথে যুক্ত থাকার ফলে অনেক সময় নানা রকম দুর্ঘটনার শিকার হয়। এসব দুর্ঘটনাগুলো অনেক সময় ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য দুঃখের প্রধান কারণ হয়ে দেখা দেয়। একজন শিশু যার প্রধান কাজ হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গঠন করা এবং পড়াশোনার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করা। সেখানে আজ একজন শিশু পড়াশোনাকে পায়ে ঠেলে দিয়ে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে। কেন সে ও তো হতে পারতো বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তার মধ্যে একজন। জন্ম কি সে নিতে চেয়েছিল এই দরিদ্র পরিবারে? কেউ কি কখনো দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহণ করতে চায়। না সবাই চায় ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করে সুখী সমৃদ্ধ ভাবে বেঁচে থাকতে। আজ বাংলাদেশে নানারকম ভাতা প্রদান করা হয়। অনেককে আবার পেনশন হিসেবে এককালীন লক্ষ কোটি টাকা প্রদান করা হয় কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় মুখগুলোকে টিকিয়ে রাখার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। অসহায়দের জন্যই তো সাহায্যের প্রয়োজন শিশুরা বর্তমানে অসহায়। কিন্তু কোথায় সাহায্য নামক সোনার হরিণের নাগাল পাওয়া যায় না। জাতিসংঘ শিশুদের জন্য ইউনিসেফ নামক একটা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে যাদের কাজ হলো শিশুদের নিয়ে। বিশ্বব্যাপী শিশুদের নিয়ে যখন এত চিন্তা তখন আমার দেশ শিশুদেরকে নিয়ে কোনো ধরনের চিন্তাভাবনা নেই। বাংলাদেশের শিশুরা কাজ করার মাধ্যমে অল্প বয়সে বিবাহ করে। এবং যে বিবাহের মাধ্যমে হাজারো সমস্যার জন্ম দেয়। ২০২১ সালের গত শনিবার বিশ্বে শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের প্রতিপাদ্য ছিল মুজিব বর্ষের আহ্বান শিশুশ্রমের অবসান। এছাড়াও ২০১৯ সালে জাতিসংঘ ২০২১ সালকে আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম নিরসন বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের সব ধরনের শিশুশ্রম বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। এছাড়াও দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮টি খাতকে শিশুশ্রম মুক্ত করার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। আশার কথা হলো আটটি খাতে শিশুশ্রম নিরসন করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমান শিশু আইন প্রণয়ন ও প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেন। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের আহ্বান তিনি যেন তাঁর লক্ষ্য থেকে সরে না যায়। চীনে শিশুদের জন্য যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সেগুলো যেন যথাযথভাবে পালন করতে পারে। এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যেন রক্ষায় সচেষ্ট থাকে এমন আমাদের প্রত্যাশা। কারণ জীব বৈচিত্র হারিয়ে গেলে তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। ঠিক তেমনি সম্ভাবনাগুলো হারিয়ে গেলে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে এমনই বলা যায়।