সাইকেলে বিশ্বজয়ী প্রথম বাঙ্গালি ভূপর্যটক হবিগঞ্জের রামনাথ

ওয়ায়েছ আহমেদ আরিফ ডিবিবি

ঢাবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১০:১০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০১৯ | আপডেট: ১০:১৮:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০১৯ |

“থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে,-
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘুর্ণিপাকে।
দেশ হতে দেশ দেশান্তরে
ছুটছে তারা কেমন করে।”

কবি নজরুলের ‘সংকল্প’ কবিতার বাস্তব প্রতিমূর্তি আমাদের এই রামনাথ বিশ্বাস। জন্ম হয় ভাটিবাংলার এক অজপাড়াগাঁয়ে। হাইস্কুলে থাকাবস্থায় যোগ দিয়েছিলেন বিপ্লবী দলে। তাতেও তিনি ক্ষান্ত হন নি, তার মনে যে বিশ্বকে দেখার দূর্বার আকাঙ্ক্ষা।

তাই দলছুট দিয়ে নিজ বাইসাইকেলে নেমে পড়েছিলেন বিশ্বজয়ে৷ বলছি সেই অখ্যাত, অজানা বাংলার এক বিস্ময়কর ভূপর্যটক এর গল্প৷

অবিভক্ত বাংলার প্রথম বিশ্বজয়ী ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাস ছিলেন চিরকুমার। সংসার এর মায়া ত্যাগ করে, তিনি ঘুরে বেড়িয়েছিলেন সারা বিশ্ব। বিশ্বকে দেখেছেন তার আপন চোখে৷ দীর্ঘ সাইকেলের ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে গল্প ও উপন্যাস মিলিয়ে ৪০টিরও বেশি বই লিখেছেন। যেখানে রয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার ১২ কি.মি. পথভ্রমণের অভিজ্ঞতা।

ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাস এর জন্ম ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে ১৩ জানুয়ারি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার বিদ্যাভূষণ পাড়ায়। স্থানীয় হরিশ্চন্দ্র নামক হাইস্কুলে থাকাকালীন স্কুল ছেড়ে বিপ্লবী দলে যোগদান করেন।

তার মনে ছিল বিশ্বকে দেখার দূর্বার আকাঙ্ক্ষা, আর এই উদ্দেশ্যেই ১৯৩১ সালের ৭ জুলাই সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন বিশ্বভ্রমণে। প্রথমে সিংগাপুর, কুয়ালালামপুর, জিত্রা, শিয়াংলু হয়ে প্রবেশ করেন থাইল্যান্ডে। থাইল্যান্ড থেকে ইন্দোচীন, চীন, হংকং, কেন্টন, সাংহাই হয়ে পিকিং। পিকিং থেকে মাঞ্চুকো, মুকদেন, আন্তং হয়ে কোরিয়া। কোরিয়া হতে জাপান, জাপান হতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হতে কানাডা। এসব দেশ জয় করে পাড়ি জমান ফিলিপাইন, বালি, জাভা, সুমাত্রাসহ ইন্দোনেশিয়ার নানা দ্বীপপুঞ্জে। ইন্দোনেশিয়া সরকার তাকে তেমন সহযোগিতা করেন নি। সেখান থেকে ফিরে আসেন সিঙ্গাপুরে। অবশেষে সিঙ্গাপুর থেকে ১৯৩৪ সালে আপন দেশে ফিরে আসেন।

১৯৩৪ সালে তিনি গ্রামে ফিরলে গ্রামবাসীরা বানিয়াচংয়ের ঐতিহাসিক এড়ালিয়া মাঠে এক বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন করেন। উক্ত সভায় রামনাথ তার বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ‘ বানিয়াচংকে বিশ্বের বৃহত্তম গ্রাম ‘ বলে উল্লেখ করেন।

তারপর খানিকটা বিরতি। পরবর্তীতে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে দ্বিগুণ উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বভ্রমণে বের হন। প্রথমে সিংগাপুর, সিংগাপুর থেকে পিনাং, তারপর পরম আগ্রহ ভরে ভারতবর্ষ ঘুরে দেখেন৷ উপমহাদেশে প্রায় এক বছর অবস্থান শেষে আফগানিস্তান, ইরাক, ইরান, সিরিয়া, লেবানন ও তুরস্ক ভ্রমণ।

তারপর শুরু করেন ইউরোপ দেখা। প্রথমেই বুলগেরিয়া। পরে যুগোস্লাভিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া, হল্যান্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড। এই দীর্ঘ পথ ভ্রমণ শেষে, দেশ বিভাগের পর ১৯৫০ সালে ভাটিবাংলার হবিগঞ্জের মানুষটি কলকাতায় স্থায়ী বসবাস শুরু করেন।

১৯৫৫ সালের ১ নভেম্বরে সেখানেই এই চিরকুমার ও অবিভক্ত বাংলার প্রথম বিশ্বজয়ী ভূপর্যটক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন৷